ধর্ম ডেস্ক
২১ মে ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
জিলহজের বরকতময় দিনগুলো মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত, ত্যাগ ও আল্লাহর স্মরণে ভরপুর। এই দিনগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ‘তাকবিরে তাশরিক’। অনেকেই এর সময়, বিধান ও করণীয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় বিভ্রান্ত হন। তাই এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন। জিলহজ মাসের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত সময়কে বলা হয় 'আইয়ামে তাশরিক'। এই দিনগুলো ইসলামি বিধানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়ে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর নির্দিষ্ট বাক্যে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা ওয়াজিব, যা ‘তাকবিরে তাশরিক’ নামে পরিচিত। (হেদায়া: ১/২৭৫)
তাকবিরে তাশরিকের বাক্যগুলোর উৎস সম্পর্কে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.)-সহ একাধিক আলেম একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন-
হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হলেন, তখন হজরত জিবরাঈল (আ.) আকাশ থেকে দুম্বা নিয়ে আসছিলেন। পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে দেখে তিনি বলে উঠলেন- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’। ইবরাহিম (আ.) সাড়া দিয়ে বললেন- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার’। আর ইসমাঈল (আ.) বললেন- ‘আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ এই বর্ণনা মারফু হাদিস নয়, তবে ফুকাহায়ে কেরাম এটি উল্লেখ করেছেন তাকবিরের শব্দাবলির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে। সূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ২/১৭৮
اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
অর্থ: আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
আরও পড়ুন: তাকবিরে তাশরিক ভুলবশত ছুটে গেলে কি গুনাহ হবে?
৯ জিলহজ (আরাফাতের দিন) ফজর নামাজের পর থেকে ১৩ই জিলহজ আছর নামাজের পর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর এই তাকবির পড়া ওয়াজিব।
গণনা: ৯ তারিখে পাঁচ ওয়াক্ত, ১০ থেকে ১২ তারিখে পাঁচ ওয়াক্ত করে পনেরো ওয়াক্ত, এবং ১৩ তারিখে ফজর-জোহর-আছর মিলে তিন ওয়াক্ত- সর্বমোট ২৩ ওয়াক্ত। সূত্র: দুররে মুখতার: ২/১৮০
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর এই তাকবির ওয়াজিব। জামাতে পড়া হোক বা একাকী, মুকিম বা মুসাফির, গ্রামে বা শহরে সবাই এর অন্তর্ভুক্ত।
পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচু স্বরে পড়বেন, তবে অন্তত নিজের কানে শুনতে পাওয়া যায় এতটুকু স্বরে পড়তে হবে।
একবার না তিনবার: ওয়াজিব হলো একবার পড়া। তিনবার পড়া নিজে নিষেধ নয়, তবে তিনবার পড়াকে সুন্নত বলে বিশ্বাস করা মাকরুহ, কারণ এর কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল নেই। সূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ২/১৭৮; ফতোয়ায়ে নাওয়াজেল: ১৪/৫৯৪
নামাজ শেষে তাকবির বলতে ভুলে গেলে পরিস্থিতিভেদে বিধান ভিন্ন।
যদি সালাম ফেরানোর পর নামাজের জায়গা থেকে না উঠেন, কথা না বলেন এবং অজু ভেঙে না যায়, তাহলে মনে পড়ার সাথে সাথে তাকবির পড়ে নিলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে।
কিন্তু নামাজ শেষে কথা বলে ফেললে, মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলে বা অজু ভেঙে গেলে তাকবির পড়ার সুযোগ আর থাকে না। যেহেতু এটি ওয়াজিব আমল, তাই ছুটে গেলে আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তেগফার করতে হবে। সূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ৬/১৭৯; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৫২
আরও পড়ুন: কোরবানি দেবেন? আগে জানুন এই আমলগুলো
আইয়ামে তাশরিকের কোনো নামাজ যদি সেই দিনগুলোর মধ্যেই কাজা আদায় করা হয়, তাহলে তাকবির পড়তে হবে। তবে আইয়ামে তাশরিকের আগের কোনো কাজা নামাজ এই দিনগুলোতে পড়লে, অথবা এই দিনগুলোর কাজা নামাজ পরে আদায় করলে তাকবির বলা ওয়াজিব নয়। সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে: ১/৪৬৪
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, জিলহজ মাসের এই দিনগুলোর আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল উত্তম নয়; এমনকি জান-মাল বাজি রেখে করা জিহাদও এর সমকক্ষ নয়, কেবল সেই শহীদ ছাড়া যে সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৯৬৯) পবিত্র কোরআনেও এই দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে বলা হয়েছে- وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ ‘এবং তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সুরা হজ: ২৮)
তাকবিরে তাশরিক একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যবহ ওয়াজিব আমল। ২৩ ওয়াক্ত নামাজের পর সচেতনভাবে এই তাকবির পড়ার মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর একত্ববাদ ও ত্যাগের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেন। এই ওয়াজিব আমলটি যেন অবহেলায় না ছোটে, সেদিকে সজাগ থাকা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।