ধর্ম ডেস্ক
১২ মে ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
জিলহজ ইসলামি বর্ষপঞ্জির সর্বশেষ ও অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস। হিজরি সনের যে চারটি মাসকে আল্লাহ তাআলা ‘সম্মানিত’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, জিলহজ তার অন্যতম (সুরা তাওবা: ৩৬) হজ ও কোরবানির কারণে এই মাসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য হলেও এর প্রথম দশ দিনের বিশেষ মর্যাদা কোরআন ও সহিহ হাদিসে স্বতন্ত্রভাবে বর্ণিত হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা ফজরে আল্লাহ তাআলা যে ‘দশ রজনীর’ শপথ করেছেন, প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা জিলহজের প্রথম দশ দিনকেই নির্দেশ করে। রাসুলুল্লাহ (স.) এই সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের নেক আমল অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে বেশি প্রিয়।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯, আবু দাউদ: ২৪৩৮) এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি প্রয়োজন।
১. রোজা রাখা
জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা বিশেষ সওয়াবের কাজ। বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন (আবু দাউদ: ২৪৩৭) বিশেষত ৯ই জিলহজ বা আরাফার দিনের রোজার ফজিলত সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আশাবাদী যে, এর মাধ্যমে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
২. বেশি বেশি জিকির ও তাসবিহ
কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী এই দিনগুলোতে আল্লাহর নাম বেশি বেশি স্মরণ করা উচিত। হাদিসে বিশেষ করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬) এছাড়া ৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আছর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ওয়াজিব।
তাকবির: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
আরও পড়ুন: জবান সিক্ত থাকুক মহামূল্যবান ৬ জিকিরে
৩. কোরবানির প্রস্তুতি
সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য কোরবানির দিনগুলোতে পশু জবাই করা ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। হাদিসে এসেছে, কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় কোনো আমল নেই। (তিরমিজি: ১৪৯৩, হাসান গরিব)। কোরবানি দাতার জন্য ১০ই জিলহজ কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার শুরু করা মোস্তাহাব।
৪. চুল ও নখ না কাটা
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কোরবানির নিয়ত করলে সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটে।’ (আবু দাউদ: ২৭৯১; নাসায়ি: ৪৩৬২) এ ছাড়া কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, যারা কোরবানি করতে পারছেন না, তারাও জিলহজের চাঁদ ওঠার পর চুল-নখ না কেটে ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের পর কাটার মাধ্যমে কোরবানির সওয়াব পাওয়ার আশা রাখতে পারেন। (আবু দাউদ: ২৭৮৯)
৫. রাতের ইবাদত ও দান-সদকা
জিলহজের রাতগুলোতে নফল নামাজ, তেলাওয়াত ও দান-সদকা বাড়িয়ে দেওয়া উত্তম। তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহ.) এই দিনগুলোতে ইবাদতে উৎসাহ দিতে বলতেন, ‘এই রাতগুলোতে তোমরা ঘরের বাতি নিভিও না।’ (অর্থাৎ দীর্ঘ সময় জেগে ইবাদত করো)। প্রতিটি নেক কাজই এই সময়ে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
আরও পড়ুন: রাতের যে আমল কখনও ছাড়েননি নবীজি
১. গুনাহ থেকে বিরত থাকা
সম্মানিত মাসগুলোতে পাপাচার করা সাধারণ সময়ের চেয়েও গুরুতর। আল্লাহ তাআলা এই মাসগুলো সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা এতে নিজেদের ওপর জুলুম (গুনাহ) করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬) তাই প্রস্তুতির প্রথম ধাপই হওয়া উচিত নিজেকে সব ধরনের অন্যায় থেকে মুক্ত রাখা।
২. নিষিদ্ধ দিনগুলোতে রোজা না রাখা
১০ থেকে ১৩ই জিলহজ- ঈদুল আজহার দিন ও পরবর্তী তিন দিন রোজা রাখা শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আইয়ামে তাশরিক হলো খাওয়া, পান করা ও আল্লাহর জিকিরের দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)
জিলহজ মাস ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়ের যথাযথ মূল্যায়নই পারে একজন মুমিনকে এই বরকতময় সময়ের পূর্ণ সুফল এনে দিতে।