ধর্ম ডেস্ক
১১ মে ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
ঈদুল আজহার সময় অনেক পরিবারই সন্তানের আকিকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। বিশেষ করে কোরবানির পশুর একটি অংশে আকিকার নিয়ত করার প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কোরবানি ও আকিকা একসাথে আদায়ের এই ধারণা ইসলামের কোন যুগে শুরু হলো? এটি কি মহানবী (স.)-এর সরাসরি সুন্নাহ, নাকি পরবর্তী যুগের ফিকহি ইজতিহাদ? দালিলিক ও ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হলো।
ইসলামি ইতিহাস ও শরিয়াহ অনুযায়ী, কোরবানি ও আকিকা দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত ইবাদত। কোরবানি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে পালিত হয়, যা ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। আর আকিকার প্রাক-ইসলামি আরবে প্রচলন থাকলেও তার নিয়ম ছিল বিকৃত। ইসলাম আগমনের পর রাসুল (স.) সেটিকে সংস্কার করে পশু জবাই, সন্তানের চুল কাটা ও দান-সদকার সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সাহাবিদের যুগে একই পশুকে কোরবানি ও আকিকার নিয়তে ভাগ করার সরাসরি কোনো ঘটনা বর্ণিত হয়নি। তবে মুসনাদে আহমাদের বর্ণনা অনুযায়ী একটি বড় পশু (উট বা গরু) সাতটি ছাগলের সমমান হিসেবে স্বীকৃত। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে তাবেয়ি ও ফকিহগণ কোরবানি ও আকিকার সমন্বিত আদায়ের বৈধতা নিয়ে আলোচনা করেন।
আরও পড়ুন: শিশুর নিরাপত্তা ও কল্যাণে আকিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
তাবেয়িন যুগে (১ম–২য় হিজরি শতক) মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাসহ বিভিন্ন হাদিস ও আছারের সংকলনে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, প্রখ্যাত তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.), কাতাদা (রহ.) এবং হিশাম ইবনে হাসান (রহ.) মত দেন-কোরবানির সময় আকিকার প্রয়োজন থাকলে একই পশুর মাধ্যমে তা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এটিকে এই বিষয়ে প্রাচীনতম আলোচ্য মতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তীতে হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে। যেমন- ‘রদ্দুল মুহতার’-এ বলা হয়েছে, উভয়টিই আল্লাহর সন্তুষ্টির ইবাদত হওয়ায় একই পশুতে কোরবানি ও আকিকার শরিক থাকতে বাধা নেই। নিয়ম অনুযায়ী একটি বড় পশুতে কোরবানির শরিকানার মতো একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে আকিকাও আদায় করতে পারবে। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩২৬)
কোরবানি ও আকিকা একসাথে আদায় নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এবং হানাফি মাজহাবের পরবর্তী ফকিহদের মতে, উভয় ইবাদতের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবাই হওয়ায় যৌথ কোরবানির ক্ষেত্রে একাধিক নিয়ত করা বৈধ। একে ‘তাদাখুলুল ইবাদাত’ বা ইবাদতের অন্তর্ভুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
অন্যদিকে কিছু শাফেয়ি ও মালিকি ফকিহদের মতে, কোরবানি ও আকিকা দুটি স্বতন্ত্র ইবাদত হওয়ায় এগুলো আলাদাভাবে আদায় করাই উত্তম।
আরও পড়ুন: আকিকার গোশত বণ্টনের নিয়ম
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে কোরবানি ও আকিকা একসাথে পালনের প্রচলন দেখা যায়, যার পেছনে হানাফি ফিকহের প্রভাব এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে যৌথ কোরবানির সংস্কৃতি জনপ্রিয় হওয়ার পর একই পশুর অংশে আকিকার নিয়ত করা বৃদ্ধি পায়।
তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক বিধান বা নববী যুগের সরাসরি সুন্নাহ নয়। এটি মূলত তাবেয়িন যুগ থেকে শুরু হওয়া ফিকহি ইজতিহাদের একটি অংশ, যা পরবর্তী আলেমদের মতপার্থক্যের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য পৃথকভাবে কোরবানি ও আকিকা আদায় করাই অধিকতর উত্তম বলে অনেক ফকিহ মনে করেন।
তথ্যসূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা; রদ্দুল মুহতার; তুহফাতুল মাওদুদ বি-আহকামিল মাওলুদ; মুসনাদে আহমদ