images

ইসলাম

কোরবানির পশু যত বড় সওয়াব কি তত বেশি?

ধর্ম ডেস্ক

০৬ মে ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেই দেশের পশুর হাটগুলোতে শুরু হয় এক নীরব প্রতিযোগিতা। কে কত বড় গরু কিনলেন, কার পশুর দাম কত বেশি- এ নিয়ে চলে নানা আলোচনা। জনমনে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, কোরবানির পশু যত বড় বা দামি হবে, সওয়াবও তত বেশি হবে। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই ধারণার সঠিক ব্যবচ্ছেদ করা জরুরি।

কোরআনের মূলনীতি: তাকওয়াই আসল

কোরবানির সওয়াব পশুর ওজন বা দামের ওপর সরাসরি নির্ভর করে না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, পশুর রক্ত বা মাংস তাঁর কাছে পৌঁছায় না। ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।’ (সুরা হজ: ৩৭)
এই আয়াতটিই কোরবানির মূল দর্শন নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ, কোরবানির গ্রহণযোগ্যতা বা কবুলিয়ত নির্ভর করে বান্দার ইখলাস বা নিষ্ঠার ওপর। নিয়ত যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে পাহাড় সমান বড় পশু কোরবানি দিলেও তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

পশমের হিসেবে সওয়াব: হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা

হাদিস শরিফে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানিতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি।’ (ইবনে মাজাহ: ৩১২৭; মেশকাত: ১৪৭৬)

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু নিয়ে সেলফি-ছবি শেয়ার, ইসলাম কী বলে

যৌক্তিকভাবেই বড় পশুর শরীরে পশম বেশি থাকে। সেই হিসেবে বড় পশুতে সওয়াব বেশি হওয়ার একটি দিক ফুটে ওঠে। তবে মুহাদ্দিসিনদের মতে, এই নেকি তখনই কার্যকর হবে যখন কোরবানিটি ‘তাকওয়া’র ওপর ভিত্তি করে হবে। লোকদেখানো মনোভাব থাকলে পশমের সংখ্যার চেয়ে ‘রিয়া’ বা লোকদেখানোর গুনাহ আমলনামায় বেশি ভারী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

qurbani-big-animal

হৃষ্টপুষ্ট পশু কেন উত্তম?

রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে কোরবানির জন্য হৃষ্টপুষ্ট ও ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচন করতেন। হাদিসে এসেছে, ‘রাসূল (স.) কোরবানির জন্য দুটি শিংযুক্ত, সাদা-কালো রঙের এবং মোটাতাজা মেষ জবেহ করতেন।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম হওয়ার প্রধান কারণ দুটি-
১. আল্লাহর রাস্তায় নিজের প্রিয় এবং উৎকৃষ্ট সম্পদটি ব্যয় করা।
২. পশুর আকার বড় হলে গোশত বেশি হয়, যার ফলে দরিদ্র ও আত্মীয়-স্বজনদের বেশি করে খাওয়ানো যায়। অর্থাৎ বড় পশুর ফজিলত মূলত এর উপযোগিতা এবং ত্যাগের গভীরতার মধ্যে নিহিত, কেবল শারীরিক আয়তনে নয়।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু কেনার আগে যাচাই করুন এই ৭টি বিষয়

সওয়াব হারানোর ভয়: লোকদেখানো কোরবানি

বর্তমানে বড় গরু কেনা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক আভিজাত্য বা মর্যাদা প্রদর্শনের উপায়ে পরিণত হয়েছে। রাসুল (স.) লোকদেখানো ইবাদতকে ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক বলে অভিহিত করেছেন। যদি কারো মনে এই সুপ্ত ইচ্ছা থাকে যে- লোকে তাকে বড় দাতা বলবে বা তার পশুর প্রশংসা করবে, তাহলে পশুর বিশালতা সত্ত্বেও সওয়াবের পরিবর্তে আমলনামায় গুনাহ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। লোকদেখানো মনোভাব ইবাদতের মূল আত্মাকেই ধ্বংস করে দেয়।

সওয়াব বাড়ে মূলত যে কারণে

ওলামায়ে কেরামের মতে, কোরবানির সওয়াব মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধি পায়-

১. নিয়তের বিশুদ্ধতা: কোরবানি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া।

২. হালাল উপার্জন: কোরবানির পশুর প্রতিটি টাকা হালাল উৎস থেকে আসা অনিবার্য।

৩. উপকারের পরিধি: পশুর গোশত যত বেশি মানুষ ও অভাবীদের মাঝে বণ্টিত হবে, সওয়াবের মাত্রা তত বাড়বে।

‘পশু যত বড়, সওয়াব তত বেশি’- কথাটি কেবল তখনই সত্য, যখন বড় পশু কেনার পেছনে ত্যাগ ও আর্তমানবতার সেবার মানসিকতা কাজ করে। আল্লাহর কাছে পশুর আকার মুখ্য নয়, বরং কোরবানিদাতার অন্তরের নিষ্ঠাই মুখ্য। লাখ টাকার বড় গরু কিনে অহংকার করার চেয়ে বিশুদ্ধ নিয়তে একটি ছোট ছাগল কোরবানি দেওয়া আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় হতে পারে। তাই বড় পশু কেনার প্রতিযোগিতা না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতিযোগিতাই হোক মুমিনের লক্ষ্য।