ধর্ম ডেস্ক
০৩ মে ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
ইসলামি শরিয়তে যেকোনো ইবাদত কবুল হওয়ার মৌলিক শর্ত হলো ‘নিয়ত’ বা অন্তরের সংকল্প। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি: ১) কোরবানির ক্ষেত্রেও নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে কোরবানির পশু কেনার সময়ই কি নিয়ত করা শর্ত, নাকি জবাইয়ের সময় নিয়ত করলে কোরবানি সহিহ হবে—এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। ফিকহশাস্ত্রের বিশ্লেষণে এর সমাধান পাওয়া যায়।
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো- কোরবানির মূল রুকন হলো পশু জবাই তথা রক্ত প্রবাহিত করা, পশু ক্রয় বা সংগ্রহ করা নয়। একারণেই ইমাম কাসানি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘বাদায়েউস সানায়ে’ কিতাবের কোরবানির অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কোরবানির পশু জবাই করার সময় অথবা পশুকে কোরবানির জন্য নির্ধারণ করার সময় নিয়ত থাকা যথেষ্ট। অর্থাৎ, কেউ যদি পশু কেনার সময় নিয়ত নাও করেন, কিন্তু জবাইয়ের সময় মনে মনে কোরবানির সংকল্প রাখেন, তাহলে তার কোরবানি যথাযথভাবে আদায় হয়ে যাবে।
শরিয়তের বিধানে ধনী ও দরিদ্রের ক্ষেত্রে নিয়তের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। যে ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব (সাহেবে নিসাব), তিনি যদি আগে থেকেই পশু ক্রয় করেন এবং ক্রয়ের সময় কোরবানির সুনির্দিষ্ট নিয়ত না-ও করেন, তবুও তার কোরবানি সহিহ হবে। কারণ তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়া পূর্ব থেকেই শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত।
আরও পড়ুন: কোরবানির নিয়ত কীভাবে করতে হয়
এক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হলো- জবাইয়ের সময় নিয়ত থাকা। অন্যদিকে, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয় (দরিদ্র), তিনি যদি কোরবানির নিয়তে পশু ক্রয় করেন, তাহলে সেই পশুটি তার জন্য কোরবানির জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তবে তিনিও যদি ক্রয়ের সময় নিয়ত না করেন, কিন্তু পরে কোরবানির সিদ্ধান্ত নিয়ে জবাইয়ের সময় সংকল্প করেন, তবে তার কোরবানিও আদায় হয়ে যাবে। বিষয়টি ‘আদ্দুররুল মুখতার’ কিতাবের কোরবানি সংক্রান্ত আলোচনায় (বাবুল উদহিয়া) বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে হানাফি ফিকহের অন্যতম গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে। কিতাবটির কোরবানি পর্বে (কিতাবুল উদহিয়া/আদাহি) বলা হয়েছে, কোরবানির ক্ষেত্রে নিয়তের উপস্থিতি প্রয়োজনীয় হলেও এই নিয়ত জবাইয়ের সময় হওয়া যথেষ্ট; পশু ক্রয়ের সময় নিয়ত থাকা শর্তস্বরূপ নয়। আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ রদ্দুল মুহতারে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, পশু ক্রয় করা ইবাদতের মূল লক্ষ্য নয়; বরং রক্ত প্রবাহিত করা বা জবাই করাই হলো মূল ইবাদত। তাই নিয়ত মূলত জবাইয়ের মুহূর্তের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
আরও পড়ুন: কীভাবে কোরবানি করলে কবুল হয়
বাস্তব প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সাধারণত কেউ যখন কোরবানির হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করেন, তখন তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই কোরবানির উদ্দেশ্য থাকে। ফিকহবিদদের মতে, এই প্রচলিত উদ্দেশ্যকে ‘শরিয়তে গ্রহণযোগ্য একটি সাধারণ অভিপ্রায়’ বা উরফি নিয়ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই মুখে স্পষ্টভাবে নিয়ত উচ্চারণ না করলেও অন্তরে এই সংকল্প থাকলে তা নিয়ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। এমনকি যদি কেউ শুরুতে ব্যবসা বা কেবল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু ক্রয় করেন এবং পরে কোরবানির দিনগুলোতে সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি এটি কোরবানি করবেন, তাহলে জবাইয়ের সময় নিয়ত করে কোরবানি করলে তা সহিহ হবে। কারণ জবাইয়ের সময়ই ইবাদতের মূল সময় শুরু হয়।
পরিশেষে বলা যায়, কোরবানির ইবাদত মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। পশু ক্রয় থেকে জবাই পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে অন্তরের নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিক নিয়ম-কানুন পালনের পাশাপাশি ইখলাস ও আন্তরিকতা কোরবানিকে আল্লাহর দরবারে কবুলযোগ্য করে তোলে।