ধর্ম ডেস্ক
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
হজ বা ওমরার সফরে পবিত্র মসজিদুল হারামে তাওয়াফরত অবস্থায় ফরজ নামাজের ওয়াক্ত চলে যাওয়া একটি বাস্তব সমস্যা। বিশেষত হজের মৌসুমে মাতাফে (তাওয়াফের স্থান) যখন লক্ষাধিক মানুষের ভিড় থাকে, তখন তাওয়াফ মাঝপথে ছেড়ে বেরিয়ে আসাও অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নামাজ ও তাওয়াফের ধারাবাহিকতা রক্ষায় শরিয়তের স্পষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের সর্বসম্মত বিধান অনুযায়ী, ফরজ নামাজ তাওয়াফের চেয়ে অগ্রগণ্য। ইমাম ইবনু কুদামা (রহ.) ‘আল-মুগনি’-তে উল্লেখ করেছেন, তাওয়াফের মধ্যে ফরজ নামাজের ইকামত হলে তাওয়াফ ছেড়ে জামাতে শরিক হওয়া আবশ্যক। ‘ফতোয়ায়ে শামি’-তে ইবনু আবিদিন (রহ.) বলেন, তাওয়াফরত অবস্থায় ফরজ নামাজের ওয়াক্ত এলে তাওয়াফ স্থগিত রেখে নামাজ পড়া জরুরি। তাওয়াফ নফল বা ওয়াজিব ইবাদত হতে পারে, কিন্তু ফরজ নামাজের গুরুত্ব সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
হজের মৌসুমে অনেক সময় ভিড়ের চাপে মাতাফ থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতির কারণে ফিকহবিদদের সিদ্ধান্ত হলো-
হারামের ভেতরে নামাজ আদায়: ইমাম নববি (রহ.) ‘আল-মাজমু’-তে বলেন, যদি তাওয়াফ ছেড়ে বের হওয়া সম্ভব না হয় এবং জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে মাতাফে বা হারামের ভেতরে সুবিধাজনক স্থানেই নামাজ আদায় করা যাবে। কেননা পুরো মসজিদুল হারামই নামাজের স্থান। এক্ষেত্রে অবশ্য কাবার দিকে মুখ (কিবলামুখী) করা শর্ত। কাবার চারদিকে যেহেতু তাওয়াফ চলে, তাই আপনি যে পাশে অবস্থান করছেন, সেখান থেকে কাবার দিকে সরাসরি মুখ করে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: তাওয়াফ কত প্রকার ও কী কী
প্রবল ভিড় বা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে যদি নামাজের ওয়াক্ত পার হয়ে যায়, তাহলে করণীয় হলো-
দ্রুত কাজা আদায়: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে যায় বা ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাফফারা হলো স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৭, সহিহ মুসলিম: ৬৮৪)
তওবা: অনিচ্ছাকৃতভাবে এমনটা ঘটলে তওবা ও দ্রুত কাজা আদায়ের মাধ্যমে দায়মুক্তি সম্ভব। তবে তাওয়াফ শেষ করার অজুহাতে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ বিলম্বিত করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
নামাজের বিরতির পর তাওয়াফ পুনরায় শুরু করা নিয়ে ফকিহগণের অভিমত হলো-
অব্যাহত রাখা: বেশিরভাগ ফকিহের মতে, যে চক্কর থেকে তাওয়াফ ছেড়েছিলেন, সেখান থেকেই পুনরায় শুরু করা যাবে; আগের চক্করগুলো বাতিল হবে না। ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) ‘মাজমুউল ফাতাওয়া’-তে বলেন, নামাজ বা অজু ভেঙে যাওয়ার কারণে তাওয়াফ মাঝপথে বন্ধ হলে পবিত্রতা অর্জনের পর বাকি তাওয়াফ সম্পন্ন করা যাবে।
হানাফি মাজহাবের অবস্থান: ‘ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া’-তে বলা হয়েছে, যদি তাওয়াফের মধ্যে বিরতি এত উল্লেখযোগ্য দীর্ঘ না হয় যে ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তাহলে পূর্ববর্তী চক্করগুলো গণনায় ধরা হবে। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ বিরতি হলে নতুন করে শুরু করা উত্তম; এটি হানাফি মাজহাবের সতর্কতামূলক অবস্থান।
আরও পড়ুন: তাওয়াফের সময় কথা বলা যাবে?
হজ বা ওমরার সফরে যাওয়ার আগে সময় সচেতন হওয়া জরুরি-
নামাজ ইসলামের প্রধান স্তম্ভ। তাওয়াফ একটি মহৎ ইবাদত হলেও নামাজের সময়কে অতিবাহিত করার সুযোগ শরিয়তে নেই। ভিড়ের কারণে পরিস্থিতির শিকার হলে ফিকহি ছাড়গুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে লক্ষ্য থাকতে হবে সর্বদা সময়মতো এবং জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের।
দ্রষ্টব্য: বিশেষ মাসয়ালা বা জটিল পরিস্থিতিতে হারামাইন শরিফাইনে দায়িত্বরত আলেম বা অভিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।