ধর্ম ডেস্ক
২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
পবিত্র কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর কেবলা এবং বিশ্বের প্রাচীনতম ইবাদতগাহ। এই ঘরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় মুমিনের নামাজ, হজ ও তাওয়াফ। তবে একটি প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে কৌতূহল জাগিয়ে রেখেছে- এই পবিত্র ঘরের প্রথম স্থপতি কে? ইসলামি বর্ণনায় কাবার ইতিহাস যেমন সুপ্রাচীন, তেমনি তা গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে সমৃদ্ধ।
পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য প্রথম যে ঘরটি নির্ধারিত হয়েছে, তা মক্কায় অবস্থিত; যা বরকতময় এবং বিশ্বজগতের জন্য পথনির্দেশনা।’
তাফসির ও কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত আদম (আ.)-এর আগমনের পূর্বে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ফেরেশতারা কাবার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এসব বর্ণনায় আরও বলা হয়, আসমানে অবস্থিত ‘বায়তুল মামুর’-এর ঠিক নিচেই পৃথিবীতে কাবার স্থান নির্ধারণ করা হয় এবং সেই আসমানি ঘরের অনুকরণেই এই ভিত্তি নির্মাণ করা হয়।
তবে দালিলিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই বর্ণনাগুলো সরাসরি কোনো সহিহ মারফু হাদিসে নেই; বরং তাফসিরগ্রন্থ ও সাহাবিদের আছার থেকে উদ্ধৃত। ফলে ওলামায়ে কেরাম এগুলোকে অকাট্য আকিদার অংশ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করেন।
আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর ‘রাজকীয় হজ’: ইতিহাসের আড়ালে থাকা বর্ণনা
বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমনের পর সেই আদি ভিত্তির ওপর কাবার কাঠামো পুনর্নির্মাণ করেন এবং সেখানে ইবাদতের প্রচলন করেন।
দীর্ঘকাল পর হজরত নূহ (আ.)-এর যুগের ভয়াবহ মহাপ্লাবনে কাবার দৃশ্যমান কাঠামো বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, কাবার মূল ভিত্তি আল্লাহর বিশেষ কুদরতে সংরক্ষিত ছিল এবং দীর্ঘ সময় বালুর নিচে চাপা অবস্থায় থাকে।
কাবার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য অধ্যায় হলো হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে এর পুনর্নির্মাণ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উঁচু করছিলেন...।’ (সুরা বাকারা: ১২৭)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, কাবার ভিত্তি পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) সেই ভিত্তিকে উঁচু করে পুনর্নির্মাণ করেন এবং আল্লাহর নির্দেশে বিশ্ববাসীকে হজের আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন: তীব্র গরমেও হারামাইনের চত্বর শীতল কেন?
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নবুয়ত লাভের পূর্বে, তাঁর বয়স প্রায় ৩৫ বছর হলে মক্কায় এক বন্যায় কাবা শরিফ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন কোরাইশরা সম্মিলিতভাবে এটি পুনর্নির্মাণ করে। এই পুনর্নির্মাণের সময় ‘হাজরে আসওয়াদ’ স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে নবী মুহাম্মদ (স.) অসাধারণ প্রজ্ঞার মাধ্যমে তা সমাধান করেন। বর্তমান কাবা শরিফ মূলত সেই কাঠামোর ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান।
পরবর্তীতে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে কাবার সংস্কার হয়েছে। ৬৮ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) কাবা পুনর্গঠন করেন। পরে ৭৪ হিজরিতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তা আবার কোরাইশ আমলের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনেন। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে সেই কাঠামোই বর্তমান রূপের ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
ফেরেশতাদের মাধ্যমে কাবার ভিত্তি স্থাপনের বিষয়টি তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া গেলেও তা সরাসরি সহিহ মারফু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এসব বর্ণনা মূলত সাহাবিদের আছার ও প্রাচীন মুফাসসিরদের উদ্ধৃতির ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে কাবা পুনর্নির্মাণের বিষয়টি কোরআন দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত, যা ইসলামি আকিদার নির্ভরযোগ্য ও অখণ্ড অংশ।
মুহাদ্দিস ও গবেষকদের মতে, যে বর্ণনাগুলো সরাসরি কোরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, সেগুলোই চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য। আর যেসব তথ্য তাফসির বা ইতিহাসভিত্তিক আছার থেকে এসেছে, সেগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয় এবং সেগুলোর ওপর বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক নয়।
তবে এসব ঐতিহাসিক বর্ণনা কাবা শরিফের প্রাচীনত্ব ও মর্যাদা অনুধাবনে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফেরেশতাদের ভিত্তি স্থাপন কিংবা পরবর্তী সংস্কার—তথ্যসূত্র যেটাই হোক না কেন, সবকিছুর মূলে রয়েছে তাওহিদ ও ইবাদতের এক অবিচ্ছেদ্য ধারা। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি কাবা কেবল একটি স্থাপনাই নয়, বরং এটি বিশ্ব মুসলিমের আধ্যাত্মিক ঐক্য ও আল্লাহর সার্বভৌমত্বের এক চিরন্তন মহাজাগতিক প্রতীক।
তথ্যসূত্র: সুরা আলে ইমরান, সুরা আল-বাকারা, তাফসির ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, আখবারু মক্কা (আল-আজরাকি)