ধর্ম ডেস্ক
২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৪ পিএম
ইসলাম এক প্রশান্তিময় ভারসাম্যের নাম। এটি কোনো অনমনীয় বা দুর্বোধ্য জীবনপদ্ধতি নয়। পবিত্র কোরআনে মুসলিম উম্মাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি।’ (সুরা বাকারা: ১৪৩) এই ‘মধ্যপন্থা’ বা ‘ওসাত’ হলো ন্যায়পরায়ণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য সমন্বয়, যেখানে জীবনবিমুখতা নেই, আবার আদর্শহীনতাও নেই।
একবার তিন ব্যক্তি নবীজি (স.)-এর ইবাদত সম্পর্কে জানার পর নিজেদের আমল নিয়ে এক ধরনের অতৃপ্তিতে ভুগছিলেন। তাঁরা অঙ্গীকার করলেন- একজন সারারাত জেগে নামাজ পড়বেন, দ্বিতীয় জন বিরতিহীন রোজা রাখবেন এবং তৃতীয় জন কখনো বিয়ে করবেন না। নবীজি (স.) তাঁদের এই অতি-কঠোরতার কথা শুনে সতর্ক করে দিয়ে বলেন- ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি; তবুও আমি রোজা রাখি আবার বিরতিও দিই, নামাজ পড়ি আবার নিদ্রাও যাই এবং আমি বিবাহিত। মনে রেখো, যে আমার সুন্নত বা আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি)
আরও পড়ুন: মুমিনের মুখের ভাষা কেমন হওয়া উচিত
রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদত সহযোগে) সাহায্য চাও।’ (সহিহ বুখারি: ৩৯)
দ্বীন পালনের এই সহজতাকে আরও জোরালো করতে তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিয়ে বলতেন- ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, বিমুখ করো না (বিরক্ত বা ভীত করো না)।’ (সহিহ বুখারি: ৬৯)
সাধ্যের অতীত বোঝা বইতে গিয়ে মানুষ মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় সে ইবাদত পালনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে না। তাই নবীজির নির্দেশ হলো- সঠিক পথে থাকা, সাধ্যমতো আমল করা এবং আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া। আল্লাহ মানুষের ওপর দুঃসাধ্য কোনো বিধান চাপিয়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিন বা কষ্ট চান না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)
আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় কোনো আমল শুরু করার চেয়ে সেটির নিয়মিত চর্চা ইসলামে বেশি গুরুত্ব পায়। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে নবীজি (স.) শিখিয়েছেন- ‘আল্লাহর কাছে সেই কাজ সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে করা হয়; যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি) এই মূলমন্ত্র মুমিনদের মনে প্রশান্তি দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে, রাতভর ইবাদতের পর ক্লান্ত হয়ে ফরজ নামাজ ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে নিয়মিত ও পরিমিত আমলই স্রষ্টার কাছে অধিক মূল্যবান।
আরও পড়ুন: বান্দার যেসব আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়
মুমিনের ইবাদত কেবল জান্নাত পাওয়ার হাতিয়ার নয়, বরং তা হতে হবে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি শুধু নিজের কাজের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে না; যদি না আল্লাহ তাঁর দয়া ও রহমত দান করেন।’ (সহিহ বুখারি) এই সত্যটি ইবাদত পালনকারীর মনে অহংকার দূর করে বিনয় সৃষ্টি করে। তখন ইসলাম পালন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না, বরং তা হৃদয়ের দাবিতে পরিণত হয়।
ইসলামি দর্শনের মূল ভিত্তি হলো স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যের মাঝে এক সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখা। ফরজের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প নফল আমল যোগ করা এবং তাতে অবিচল থাকাই নববী প্রজ্ঞা। নিজের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে বাস্তবসম্মত ইবাদত মুমিনকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। ধর্ম হোক সহজ, সাবলীল এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম।