ধর্ম ডেস্ক
১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
হজ ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ। এটি মুমিনের আত্মিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের এক অনন্য মাধ্যম। হজের প্রতিটি বিধানের গভীরে নিহিত রয়েছে আখলাকি বা চারিত্রিক শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনানুসারে, হজের এই দীর্ঘ সফরে একজন মুমিনের প্রধান পাথেয় হলো ‘সবর’ বা ধৈর্য এবং গভীর আত্মসংযম।
হজের মূল আমল জিলহজ মাসে হলেও এর কার্যক্রম শুরু হয় শাওয়াল মাস থেকেই। শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ এই তিন মাসকে বলা হয় হজের মাস। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হজের রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মাস। এই মাসগুলোতে যারা নিজেদের ওপর হজ অপরিহার্য করবে, তাদের কর্তব্য অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা, সকল পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা এবং ঝগড়া-বিবাদ না করা।’ (সুরা বাকারা: ১৯৭)
হজ মূলত ধৈর্যের চরম পরীক্ষা। দীর্ঘ এই সফরে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা মানুষের মেজাজ বা সহ্যক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। আর এখানেই সবরের সার্থকতা। আলেমগণের মতে, সবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘আস-সবরু আনিল মাআসি’ বা গুনাহ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশেষ করে প্রচণ্ড ভিড় ও সফরের ক্লান্তির মাঝেও চারিত্রিক মাধুর্য বজায় রাখা এবং দৃষ্টির হেফাজত করার মাধ্যমে হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়।
আরও পড়ুন: মকবুল হজের জন্য যেসব শর্ত ও মাসয়ালা জানা জরুরি
হজের সফরে অনেক সময় অব্যবস্থাপনা বা অন্যের কারণে কষ্ট হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোরআন বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছে- যতই উসকানি আসুক, ঝগড়া করা যাবে না। রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়ের ওপর থেকেও ঝগড়া ত্যাগ করে, তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়।’ (জামে তিরমিজি: ১৯৯৩) কোরআন মজিদ বার্ধক্যের সময় পিতা-মাতার সাথে যেমন কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে, হজের সময়ও ঝগড়া ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে একইভাবে। কারণ এটি ইবাদতের মূল আমেজকে নষ্ট করে দেয়।
হজ মূলত আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যের এক অনন্য সফর। দীর্ঘ পথের কষ্টকে ছাপিয়ে যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের প্রবল ইচ্ছা। প্রাচীনকালে মানুষ মাসের পর মাস দুর্গম পথ পাড়ি দিতেন কেবল মালিকের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতায়। পথের দূরত্ব তাঁদের কাছে গৌণ ছিল, কারণ লক্ষ্য ছিল মহান স্রষ্টার দিদার। এই সমর্পণই একজন হাজিকে সাধারণ মুসাফির থেকে আলাদা করে ‘আল্লাহর মেহমান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আরও পড়ুন: ধৈর্যের মহাপুরস্কার ও অধৈর্যের আক্ষেপ
যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তার জন্য তা আদায় করা অপরিহার্য। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ না করার ব্যাপারে কুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘যার সামর্থ্য আছে তার জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে অস্বীকার করবে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ জগতবাসী থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)
সঠিকভাবে হজ সম্পন্নকারীর জন্য রয়েছে অভাবনীয় পুরস্কার। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘হজে মাবরুর বা কবুল হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা বারবার হজ ও ওমরা করো। কারণ এ দুটি আমল গুনাহ ও দারিদ্র্যকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন হাপর লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি: ৮১০)
হজ থেকে অর্জিত সবর ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণ যদি একজন হাজি তাঁর পরবর্তী জীবনে ধরে রাখতে পারেন, তবেই হজের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হয়। এটি কেবল কয়েক দিনের সফর নয়, বরং জীবনের বাকি পথকে পরিবর্তনের এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের মহান শিক্ষাগুলো ব্যক্তিজীবনে ধারণ করার তাওফিক দান করুন।