images

ইসলাম

নতুন বছর: মুমিনের আত্মশুদ্ধি ও আগামীর প্রস্তুতি

ধর্ম ডেস্ক

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

সময়ের চাকা ঘুরে আরও একটি বছর আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল। সময় মহান আল্লাহর দেওয়া এক অমূল্য আমানত। একজন মুমিনের কাছে নতুন বছর আত্মশুদ্ধি ও জীবনের হিসাব মেলানোর নতুন সুযোগ। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসলমানরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে স্বকীয়তা রক্ষা করবে এবং কোনো বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করবে না। নববর্ষের এই সূচনালগ্নে একজন মুমিনের যাপিত জীবন কেমন হওয়া প্রয়োজন, তা নিয়ে আজকের আয়োজন।

আত্মজিজ্ঞাসা বা মুহাসাবা

নতুন বছরের শুরুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। বিগত বছরে কতটুকু সময় আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয়েছে আর কতটুকু অবহেলায়, তার একটি হিসাব মেলানো জরুরি। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেরাই নিজেদের হিসাব নাও। তোমাদের আমলনামা পরিমাপ করার আগে তোমরা তা পরিমাপ করো।’ (মুসনাদে আহমদ: ৬৩৩) অতীতের গুনাহের জন্য তওবা করে নতুন করে পথচলার সংকল্পই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

ইবাদতে নিরবচ্ছিন্নতা ও নিষ্ঠা

মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। নতুন বছরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো জামাতের সাথে আদায় করার ব্যাপারে অধিক যত্নশীল হওয়া সময়ের দাবি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ৪১৩) নামাজের পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত কিয়দাংশ হলেও অর্থসহ কোরআন তেলাওয়াত ও সেই অনুযায়ী আমল করার পরিকল্পনা থাকা উচিত। এটি মুমিনের অন্তরে আত্মিক প্রশান্তি ও সঠিক পথের দিশা দেয়।

আরও পড়ুন: নতুন বছরে সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য যে দোয়া করবেন

প্রাপ্তির শুকরিয়া ও বিপদে ধৈর্য

সুস্থভাবে একটি বছর অতিক্রম করতে পারা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। এজন্য মহান রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় করো তবে আমি অবশ্যই বাড়িয়ে দেব’ (সুরা ইবরাহিম: ৭) আবার গত বছরে যারা নানা বিপদ-আপদ বা শোকের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের জন্য রয়েছে ধৈর্যের শিক্ষা। বিপদকে ভাগ্যের অংশ মনে করে সবর করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হয়।

সময়ের ব্যবস্থাপনা ও পরকালীন পাথেয়

মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। অপ্রয়োজনীয় আড্ডা বা অর্থহীন কাজে সময় ব্যয় না করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। মৃত্যুর আগে যেন সৎকর্মের পরিমাণ বাড়ানো যায়, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগে’ (সুরা মুনাফিকুন: ১০) রাসুলুল্লাহ (স.) নতুন সময়ের শুরুতে দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর এই চাঁদকে উদিত করুন শান্তি ও ঈমানের সঙ্গে, নিরাপত্তা ও ইসলামের সঙ্গে’ (জামে তিরমিজি)

আরও পড়ুন: পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: শায়খ আহমাদুল্লাহর পর্যবেক্ষণ

উন্নত চরিত্র ও সামাজিক কল্যাণ

ইসলাম কেবল ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি সুন্দর আচরণেরও সমষ্টি। নতুন বছরে পরিবার, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের সাথে আচরণের উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন। গিবত, পরনিন্দা ও মিথ্যা বর্জন করে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা মুমিনের ভূষণ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর’ (সহিহ বুখারি: ৬০৩৫) এছাড়া আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার পরিকল্পনা মুমিনের ইমানকে পূর্ণতা দেয়।

হালাল উপার্জন ও জীবনধারা পরিবর্তন

হালাল রুজি ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। নতুন বছরে সুদ, ঘুষ ও ধোঁকাবাজিসহ সকল প্রকার হারাম কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার দৃঢ় শপথ নিতে হবে। নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সদিচ্ছা ও কর্মতৎপরতা প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়।’ (সুরা রাদ: ১১)

নতুন বছর মানে আয়ু কমে যাওয়ার একটি সংকেত। প্রতিটি দিন আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই মুমিনের উচিত উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় গা না ভাসিয়ে বাস্তবমুখী হওয়া। আমাদের প্রতিটি কাজের প্রতিফলন আখেরাতে দেখা যাবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এই যে মানুষ তাই পায় যা সে করে, আর এই যে তার কর্ম অচিরেই দেখানো হবে।’ (সুরা নাজম: ৩৯-৪১) জিহ্বার ছোট ভুল যেমন ঈমানের ক্ষতি করে, তেমনি সময়ের সামান্য অপচয় পরকালে আফসোসের কারণ হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নতুন বছরে সঠিক ও সুন্দর পথে চলার তাওফিক দান করুন।