images

ইসলাম

পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: শায়খ আহমাদুল্লাহর পর্যবেক্ষণ

ধর্ম ডেস্ক

১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

মানুষের জীবন ও সমাজে আনন্দ-উৎসবের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আনন্দকে কখনোই নিষিদ্ধ করেনি; বরং তা সুশৃঙ্খল, শালীন এবং ঈমানি সীমার মধ্যে উদযাপনের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সম্প্রতি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখ এবং এর বর্তমান উদযাপন পদ্ধতি নিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট আলেম ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।

পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক বিবর্তন

শায়খ আহমাদুল্লাহর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস তিনটি স্তরে বিভক্ত।
প্রথমত, এটি ছিল জমিদারি আমলে খাজনা আদায়ের একটি দিন। বছরশেষে প্রজাদের কাছ থেকে পাওনা আদায় করে জমিদারেরা বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টিমুখ করাতেন।
দ্বিতীয়ত, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এটি ‘হালখাতা’ উৎসবে রূপ নেয়। ব্যবসায়ীরা বকেয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানাতেন এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন। এটি ছিল একটি সামাজিক ও পেশাগত আয়োজন।
তৃতীয়ত, আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সূচনা ঘটে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, পরে তা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত হয়।

আরও পড়ুন: থার্টিফার্স্ট নাইট: আনন্দ নাকি আতঙ্ক? ইসলাম কী বলে 

মঙ্গল শোভাযাত্রা: আকিদাগত দৃষ্টিভঙ্গি

আয়োজকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ মানে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রা। তবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এই ধারণার সঙ্গে একটি বিশ্বাসগত দিক জড়িত, যা ইসলামি আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শোভাযাত্রায় বিভিন্ন প্রাণী ও মুখোশ ব্যবহার করে অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল আহ্বানের যে ধারণা প্রচলিত, ইসলামে মঙ্গল ও অমঙ্গলের একমাত্র মালিক ও নিয়ন্তা মহান আল্লাহ।
পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ১৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর ইচ্ছার বাইরে কারও কোনো ক্ষমতা নেই- এটি ইসলামি তাওহিদের মৌলিক শিক্ষা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা (১৫ এপ্রিল ২০১৮)-এর একটি প্রতিবেদনে শিরোনাম ছিল- ‘ঢাকার পয়লা যেন অষ্টমীর একডালিয়া’- যা এই উৎসবের সাংস্কৃতিক রূপান্তর সম্পর্কে একটি আলোচিত পর্যবেক্ষণ।

আরও পড়ুন: মুসলিম উম্মাহ আজ বহুমুখী ষড়যন্ত্রের কবলে: শায়খ আহমাদুল্লাহর উদ্বেগ

প্রতীকী অনুষঙ্গ ও ধর্মীয় সাদৃশ্য

শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রতীক- যেমন পেঁচা, ইঁদুর, হাঁস, সিংহ ইত্যাদি হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দেব-দেবীর বাহন হিসেবে পরিচিত।
পেঁচা: লক্ষ্মীর বাহন
ইঁদুর: গণেশের বাহন
হাঁস: সরস্বতীর বাহন
সিংহ: দুর্গার বাহন
এই প্রতীকগুলোর সঙ্গে মঙ্গল ও অমঙ্গলের ধারণাগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, এমন বিশ্বাস শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে মহানবী মুহাম্মদ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ)

সংস্কৃতি ও চাপিয়ে দেওয়া প্রথা

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, নবান্ন উৎসবের মতো গ্রামীণ ঐতিহ্য, যেখানে নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দে পিঠা-পায়েসের আয়োজন করা হয়, তা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
তবে যখন কোনো উৎসবে এমন প্রতীক, আচার ও বিশ্বাস যুক্ত হয় যা তাওহিদের পরিপন্থী, তখন তা নিছক সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে না। তিনি বলেন- ‘বাঙালি সংস্কৃতির নামে মুসলিমদের ওপর ভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’

আরও পড়ুন: কোরআনে মুসলমানদেরকেই মুসলিম হওয়ার নির্দেশ

বৈশাখি ভাতার বিধান

সরকারি বা বেসরকারিভাবে দেওয়া ‘বৈশাখি ভাতা’ গ্রহণ করা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়, কারণ এটি কেবল আর্থিক সুবিধা হিসেবে প্রদান করা হয়। তবে এই অর্থ যদি কোনো হারাম বা নাজায়েজ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে।

পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে ইসলামের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ। যে কোনো সংস্কৃতি যদি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যেখানে বিশ্বাসগত উপাদান, প্রতীক বা আচার তাওহিদের পরিপন্থী হয়ে ওঠে, সেখানে মুসলিম সমাজের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

অতএব, ঈমানি পরিচয় ও স্বকীয়তা রক্ষার মাধ্যমে সংস্কৃতি গ্রহণ বা বর্জনের বিষয়ে সচেতন থাকা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।