ধর্ম ডেস্ক
১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনে ভুগছে। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এনজাইটি বা দুশ্চিন্তা কেবল মনের রোগ নয়; এর ফলে তীব্র মাথাব্যথা, পেশি বেদনা ও আতঙ্ক ব্যাধিসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান যখন এসবের প্রতিকার খুঁজছে, ইসলামি জীবনদর্শন তখন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই এর কার্যকর আধ্যাত্মিক ও মানসিক সমাধান প্রদান করেছে।
আলেমদের মতে, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির প্রথম চাবিকাঠি হলো ঈমান ও তাকওয়াকে মজবুত করা। যার ঈমান যত শক্তিশালী, মানসিক বিপর্যয় তাকে তত কম স্পর্শ করে। ঈমানদার ব্যক্তির এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে- ‘আল্লাহ আমার পরিস্থিতি দেখছেন এবং তিনি অবশ্যই এর একটি সমাধান করবেন।’ এই ইতিবাচক মানসিকতা তাকে ডিপ্রেশনে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে।
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও বিচারক মুফতি তাকী উসমানী (হাফি.) এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে- যদি দুশ্চিন্তার ফলে কারো গুনাহ বৃদ্ধি পায় এবং ইবাদত কমে যায়, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা বা আজাব হিসেবে গণ্য হতে পারে।
পক্ষান্তরে, দুশ্চিন্তার ফলে যদি আমল বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহর প্রতি অনীহা তৈরি হয়, তবে ওই পেরেশানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম বা আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও পড়ুন: দোয়া পড়লে মস্তিষ্কে কী ঘটে? কোরআন ও আধুনিক সাইকোলজির অভাবনীয় সমন্বয়
সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) মসজিদে আবু উমামাহ (রা.)-কে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখে একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছিলেন, যা নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহ দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। দোয়াটি হলো- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট যাবতীয় চিন্তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি তোমার নিকট দুর্বলতা ও অলসতা হতে আশ্রয় কামনা করছি, তোমার নিকট কাপুরুষতা ও কৃপণতা হতে নাজাত কামানা করছি এবং আমি তোমার নিকট ঋণভার ও মানুষের দুষ্ট প্রভাব হতে পরিত্রাণ চাচ্ছি। (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৫৫)
ইসলামি স্কলারগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানসিক প্রশান্তির ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম চিহ্নিত করেছেন-
১. তাকদিরে বিশ্বাস: আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে মানসিক চাপ অনেকাংশে লাঘব হয়।
২. চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন: পার্থিব মসিবতের চেয়ে আখেরাতের ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৩. নিচের দিকে তাকানো: নিজের চেয়েও যারা বেশি কষ্টে আছে, তাদের দেখে ধৈর্য ধারণ করা।
৪. তাওয়াক্কুল: মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
৫. সবর: বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং মনে রাখা যে- কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে।
৬. সালাতুল হাজত: দুশ্চিন্তার সময় নফল নামাজে মগ্ন হওয়া।
৭. ইস্তেগফার: নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করা, যা সংকট উত্তরণের পথ প্রশস্ত করে।
৮. দরুদ পাঠ: এটি দুশ্চিন্তা মুক্তির জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও পরীক্ষিত একটি আমল।
৯. পরামর্শ করা: নির্ভরযোগ্য ও বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা।
১০. মাসনুন দোয়া: বিশেষ করে ‘দোয়ায়ে ইউনুস’ এবং অন্যান্য জিকির বেশি বেশি পাঠ করা।
আর পড়ুন: অজুর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বা ‘মাইন্ডফুলনেস’ মূলত ইসলামের ‘সবর’ ও ‘জিকুরুল্লাহ’রই একটি প্রতিফলন। জিকির এবং তাহাজ্জুদের নির্জন প্রহরে অশ্রুবিসর্জন করে দোয়া করা মানুষের মানসিক চাপ বা ইমোশনাল বার্ডেন হালকা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
মানসিক অস্থিরতা জীবনের একটি অনিবার্য অংশ। এটি দূর করার সর্বোত্তম উপায় হলো- ঈমানি শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। তবে মনে রাখা জরুরি, মানসিক রোগের জটিল পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আধ্যাত্মিক আমল এবং সুচিকিৎসার সমন্বয়ই একজন মানুষকে প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি দান করতে পারে।