ধর্ম ডেস্ক
১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর বাণী এবং মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এই কিতাবের মাহাত্ম্য এত বেশি যে, জ্বিন জাতি এবং ফেরেশতারাও এর তেলাওয়াত শোনার জন্য উদগ্রীব থাকে। সুরা আহকাফের ২৯-৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জ্বিনদের একটি দল যখন নবী কারিম (স.)-এর কণ্ঠে তেলাওয়াত শুনল, তখন তারা পরম মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করল এবং নিজ জাতির কাছে গিয়ে এর সত্যতার সাক্ষ্য দিল। এমনকি ফেরেশতারাও ফজরের তেলাওয়াত শোনার জন্য সমবেত হন বলে সুরা বনী ইসরাঈলে উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কোরআনের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব আজ এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোরআন আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা ও সাফল্যের সোপান। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা এই মহাগ্রন্থ শিখতে ও তেলাওয়াত করতে অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা করছি। কোরআনের সহিহ-শুদ্ধ তেলাওয়াত না শেখা এবং একে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ না করা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে কোরআনের অবমূল্যায়ন হিসেবেই বিবেচিত। আমাদের চারপাশের অহেতুক কত বিষয়ে আমরা সময় ও শ্রম ব্যয় করি, অথচ কোরআন শিক্ষার জন্য ন্যূনতম সময় বরাদ্দ রাখা হয় না। এটি কোরআনের সঙ্গে আমাদের দূরত্বের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় কোরআনিক শিক্ষার অনুপস্থিতি নিয়ে আজ সমাজচিন্তকদের মাঝে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যখন পার্থিব সব বিষয় শেখার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে কিন্তু কোরআন শিক্ষা ঐচ্ছিক বা অবহেলিত হয়, তখন তা এক ধরনের আদর্শিক শূন্যতা তৈরি করে। কোরআনকে কেবল গিলাফে মুড়িয়ে শ্রদ্ধার সাথে তুলে রাখার চেয়েও বড় বিষয় হলো একে অধ্যায়ন করা ও জীবনের পাথেয় বানানো। একে কেবল আলমারিতে বন্দি করে রাখা কোরআনের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী কি না, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতের ফজিলত
পবিত্র কোরআন কেবল তেলাওয়াতের জন্য নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজ পরিচালনার এক শক্তিশালী নীতিমালা। সুরা মায়েদার ৪৪ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতগুলোতে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী জীবন ও সমাজ পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর দেওয়া নীতিমালা বিসর্জন দিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশি বা বিজাতীয় রীতির অনুসরণ করে, তারা মূলত হেদায়েত থেকে বিচ্যুত হয়। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ বলেছেন, ‘এ কোরআন সেই পথ দেখায়, যা সর্বাপেক্ষা সরল।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৯)। কোরআনি বিধানের পরিবর্তে অন্যকোনো দর্শনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা কোরআনের মর্যাদার অবমূল্যায়ন হিসেবেই গণ্য হতে পারে।
কোরআনে যে বিষয়গুলোকে স্পষ্টভাবে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেমন সুদ, মদ ও অনৈতিকতা; সেগুলোকে ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে গুরুত্ব না দেওয়া কোরআনের বিধানের সরাসরি অমর্যাদা। সুরা বাকারার ২৭৮-২৭৯ নম্বর আয়াতে সুদকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধের শামিল বলা হয়েছে। কোরআনের এই অকাট্য বিধানগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলা কোরআনের প্রতি আমাদের উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
কোরআনের কদর বুঝতে হলে ইমানি চেতনা ও গভীর ভালোবাসার প্রয়োজন। সুরা হাশরে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি যদি এ কোরআনকে কোনো পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে অবনত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।’ (সুরা হাশর: ২১)। পাহাড় যে কিতাবের ভারে বিদীর্ণ হওয়ার উপক্রম হয়, সেই কিতাবের অনুসারী হয়ে আমাদের বর্তমান উদাসীনতা আজ গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। তেলাওয়াত, অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনই হতে পারে মুসলিম সমাজের সামগ্রিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি।