images

ইসলাম

প্রথম সেলাই করা কাপড় ও কলমের ব্যবহার যে নবীর হাত ধরে শুরু

ধর্ম ডেস্ক

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

মানব ইতিহাসের প্রথম সহস্রাব্দের এক অনন্য আলোকবর্তিকা ছিলেন হজরত ইদ্রিস (আ.)। মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের প্রায় ৩৮০ বছর পর ইরাকের প্রাচীন বাবেল শহরে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন নবী হজরত নূহ (আ.)-এর প্রপিতামহ। আদম (আ.)-এর পর তিনিই প্রথম নবী, যাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলা ৩০টি সহিফা নাজিল করেন। তাঁর মূল নাম ‘আখনুখ’। বহুবিদ্যায় পারদর্শী ও অবিরত জ্ঞানচর্চায় মগ্ন থাকায় তিনি ‘ইদ্রিস’ (বিদ্যাবিশারদ) নামে পরিচিতি লাভ করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম।’ (সুরা মরিয়ম: ৫৭)

হিজরত ও রাষ্ট্র পরিচালনা

হজরত ইদ্রিস (আ.) মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত ও সত্যের পথে আহ্বান করতেন। কিন্তু তৎকালীন অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের অবর্ণনীয় নির্যাতনের কারণে আল্লাহর নির্দেশে তিনি ইরাক থেকে মিসরের নীল নদের তীরে হিজরত করেন। ইতিহাসে তিনিই প্রথম হিজরতকারী নবী। নীল নদের তীরে তিনি একটি সুশৃঙ্খল সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। সমাজ ও রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি ভূখণ্ডকে চার ভাগে বিভক্ত করে চারজন গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন, যা আজকের আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থারই এক আদি রূপ।

বস্ত্র সেলাই শিল্পের প্রবর্তক

সৃষ্টির শুরুতে মানুষ লজ্জা নিবারণের জন্য পশুর চামড়া বা গাছের লতাপাতা ব্যবহার করত। হজরত ইদ্রিস (আ.)-ই প্রথম সুঁই আবিষ্কার করে কাপড় সেলাই করে পরিধান করার প্রথা চালু করেন। তিনি ছিলেন জগতের প্রথম ‘দর্জি’। তিনি কেবল নিজের কাপড়ই সেলাই করতেন না, বরং সাধারণ মানুষকেও কাপড় সেলাইয়ের কৌশল শেখাতেন। তাঁর মাধ্যমেই মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদে আধুনিক রুচিবোধের সূচনা ঘটে। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ৮৩৮)

আরও পড়ুন: ঈসা (আ.) যে শহরে দাজ্জালকে হত্যা করবেন

লিখনপদ্ধতি ও কলমের উদ্ভাবন

সভ্যতার বিকাশে লিখন পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। হজরত ইদ্রিস (আ.)-ই প্রথম মানব, যিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘ইলহাম’ বা বিশেষ জ্ঞান লাভ করে কলমের সাহায্যে লিখন পদ্ধতি শুরু করেন। তাঁর আগে পৃথিবীতে কলমের কোনো ব্যবহার ছিল না। এই লিখন পদ্ধতির মাধ্যমেই জ্ঞান সংরক্ষণ ও উত্তরসূরিদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ৮৩৮)

চিকিৎসা ও অঙ্কশাস্ত্রে অবদান

হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর মাধ্যমেই চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর রূপ পায়। ইতিহাসবিদ আল-কিফতি তাঁর ‘তারিখুল হুকামাত’-এ লিখেছেন, ‘ইদ্রিস (আ.) হলেন প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানী; এ বিষয়ে তাঁর কাছে আসমান থেকে ওহি আসত।’ (বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, পৃষ্ঠা: ৫৪)

এছাড়া সব বিজ্ঞানের জননী হিসেবে পরিচিত ‘অঙ্কশাস্ত্র’ বা গণিতেরও আদি সূত্রপাত ঘটে তাঁর হাত ধরে। আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়ার মাধ্যমে সংখ্যার যে অস্তিত্ব প্রকাশ পায়, তাকে তিনি গণনা ও হিসাব-নিকাশের পর্যায়ে নিয়ে যান।

আরও পড়ুন: মুহূর্তে সিংহাসন উধাও! সুলাইমান (আ.)-এর কাছে নত হলেন রাণী বিলকিস

ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি

সামাজিক ন্যায়বিচার ও বাণিজ্যিক স্বচ্ছতার জন্য ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি হজরত ইদ্রিস (আ.) সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। পণ্যের সঠিক আদান-প্রদান ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে তাঁর এই আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক। মহান আল্লাহর নির্দেশনায় তিনি মানুষকে সঠিক মাপে লেনদেন করার শিক্ষা দেন, যা সভ্য সমাজের অন্যতম ভিত্তি।

লোহার ব্যবহার ও প্রযুক্তির সূচনা

লোহা দিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র তৈরির কৌশল হজরত ইদ্রিস (আ.)-ই প্রথম উদ্ভাবন করেন। এই লোহার অস্ত্রের সাহায্যেই তিনি কাবিল গোত্রের অবাধ্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে আল্লাহর জমিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই উদ্ভাবনই পরবর্তীকালে মানব সভ্যতায় ধাতব প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে।

আজকের দুনিয়ায় আমরা যেসব আধুনিক বৈজ্ঞানিক সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত লাইফস্টাইল ভোগ করছি, তার বীজ বপন করেছিলেন এই মহান নবী। হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, ইসলাম ও বিজ্ঞান কখনো আলাদা নয়; প্রকৃত সভ্যতা আল্লাহর নির্দেশিত জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।