ধর্ম ডেস্ক
০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
ইসলাম স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও সৃষ্টির সঙ্গে সুন্দর আচরণের এক অপূর্ব সমন্বয়। কেবল নামাজ-রোজার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নৈতিকতা ও সদাচরণের মাধ্যমেই একজন মুমিনের ঈমান পূর্ণতা পায়। আধুনিক যুগে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে অনেক সময় সদাচরণের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী, এটিই ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চরিত্রের প্রশংসা করে এর গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলম: ৪)। রাসুলুল্লাহ (স.) কেন প্রেরিত হয়েছিলেন, তা তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করার জন্য।’ (মুয়াত্তা মালিক: ১৬১৪)। অর্থাৎ, ইবাদতের পাশাপাশি নৈতিকতাকে শীর্ষে রাখাই ছিল ইসলামের মূল লক্ষ্য।
পরকালে মানুষের আমল যখন মাপা হবে, তখন সুন্দর চরিত্রই হবে মিজানের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামায় সুন্দর চরিত্রের চেয়ে বেশি ভারী আর কোনো জিনিস হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি: ২০০২)
আরও পড়ুন: আত্মীয়তা রক্ষা করলে আল্লাহ সুসম্পর্ক রাখেন
সুন্দর আচরণের মাধ্যমে মুমিন নফল ইবাদতের চেয়েও উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিন ব্যক্তি তার সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে (দিনের) রোজাদার ও (রাতের) তাহাজ্জুদ আদায়কারীর মর্যাদা লাভ করে।’ (সুনানে আবু দাওদ: ৪৭৯৮)
ইসলামি শরিয়তে সদাচরণ জীবনের প্রতিটি স্তরে পরিব্যাপ্ত-
পিতা-মাতার সাথে: সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা। (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩; সহিহ বুখারি: ৫৯৭১)
আত্মীয়-স্বজনের সাথে: সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও সহযোগিতা। (সুরা নিসা: ৩৬; সহিহ বুখারি: ৫৯৮৫)
প্রতিবেশীর সাথে: ইসলাম অনুযায়ী প্রতিবেশী তিন প্রকার- মুসলিম আত্মীয়, মুসলিম অনাত্মীয় এবং অমুসলিম; সবার সাথেই সদ্ব্যবহার জরুরি। (সহিহ বুখারি: ৬০১৪)
অধীনস্থদের সাথে: কর্মচারী বা সাহায্যকারীদের সাধ্যের বাইরে কাজ না দেওয়া এবং মানবিক আচরণ করা। (সহিহ বুখারি: ৩০)
সাধারণ মানুষের সাথে: সবার সাথে ভদ্রতা, ক্ষমা ও নম্রতা বজায় রাখা। (তাফসির, সুরা বাকারা: ৮৩; সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)
আরও পড়ুন: অধীনস্থের প্রতি যারা কোমল তাদের জন্য নবীজির দোয়া
কেয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সবচেয়ে কাছে বসার সুযোগ পাবেন তারা, যাদের আচরণ ছিল সুন্দর। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে বসবে সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর।’ (তিরমিজি: ২০১০; সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৮২)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, সদাচরণ ও আত্মীয়তার সম্পর্কের মর্যাদা এতই বেশি যে তা সরাসরি আল্লাহর আরশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক (রাহিম) আল্লাহর আরশ ধরে ঝুলে আছে এবং বলছে- যে ব্যক্তি আমার সম্পর্ক বজায় রাখবে, আল্লাহ তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৪১৩)। এছাড়া কেয়ামতের দিন ‘সদাচরণ’ বা ‘সুকৃতি’ (আল-বিরর) মানুষের অবয়বে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে কথা বলবে এবং আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমেই মানুষের বিচার করবেন ও পুরস্কার দান করবেন। (মুসনাদে আহমদ: ৮৮৭১)
ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম বণিকদের সততা ও সদাচরণ দেখেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম ছড়িয়েছিল। আজকের অসহিষ্ণু সমাজে এই নৈতিক শিক্ষাই হতে পারে মুক্তির পথ। প্রকৃত মুমিন কেবল মসজিদে নয়, বরং কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনেও হবে সুন্দর চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।
সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামে ফরজ ইবাদতের পর মিজানের পাল্লায় সদাচরণের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আমল আর নেই। এটি কেবল আধ্যাত্মিক গুণ নয়, বরং রিজিক বৃদ্ধি ও পরকালীন মুক্তির চাবিকাঠি। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য মানুষের সঙ্গে আচরণের মাধুর্য বজায় রাখা অপরিহার্য।