images

ইসলাম

মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না গেলে বিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া জায়েজ?

ধর্ম ডেস্ক

১৮ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

ইসলামি পঞ্জিকা বা হিজরি সনের মাসগুলো চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। রমজান, ঈদ বা হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলো চাঁদ দেখার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু আবহাওয়াগত কারণে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে এবং খালি চোখে চাঁদ দেখা না গেলে বিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া বা আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রাপ্ত সাক্ষ্য কতটা গ্রহণযোগ্য? এ বিষয়ে কোরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে সাক্ষ্যের বিধান

ইসলামি শরিয়ত চাঁদ দেখার বিষয়টিকে অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবসম্মত রেখেছে। প্রখ্যাত ফকিহদের মতে, আকাশ আচ্ছন্ন থাকলে রমজানের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার জন্য একজন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, বালেগ এবং নির্ভরযোগ্য মুসলিমের (নারী বা পুরুষ) সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তবে ঈদের চাঁদের ক্ষেত্রে অন্তত দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারীর সাক্ষ্য প্রয়োজন। (আলবিনায়া: ৪/২৫; রদ্দুল মুহতার: ২/৩৯১; হিন্দিয়া: ১/১৯৭)
অন্যদিকে, আকাশ যদি সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে, তবে একক ব্যক্তির সাক্ষ্য যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে এত অধিক সংখ্যক মানুষের সাক্ষ্য প্রয়োজন, যার মাধ্যমে দায়িত্বশীল আলেম ও বিচারকদের মনে বিষয়টি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়। (হেদায়া: ১/১১৯)

দূরবীন ও টেলিস্কোপের ব্যবহার: ফকিহদের মত

আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে দূরবীন বা টেলিস্কোপের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞ আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ইসলাম মানুষকে জটিল কোনো যন্ত্রপাতির মারপ্যাঁচে না ফেলে সাধারণ চোখে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে বিধান প্রদান করেছে। তবে অনেক ফকিহের মতে, যদি কেউ দূরবীন বা টেলিস্কোপের সাহায্যে নিজ এলাকার দিগন্তে সঠিক সময়ে চাঁদ দেখতে সক্ষম হয়, তবে সেই ‘দেখা’ শরয়িভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ, যন্ত্রটি মূলত মানুষের দৃষ্টিশক্তির সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে এবং এর মাধ্যমে চাঁদটি সচক্ষেই দেখা হয়েছে। (ইমদাদুল ফতোয়া: ২/১১৫)

আরও পড়ুন: যে ১০ কারণে বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ সম্ভব নয়

কেবল গাণিতিক হিসাব চূড়ান্ত নয়

বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চাঁদের অবস্থান সম্পর্কে আগেই ধারণা দিতে পারেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি হলো- চাঁদ সচক্ষে দেখার ওপর ভিত্তি করে মাস শুরু করা। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করো। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তবে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৯)

এর অর্থ হলো, আকাশে চাঁদের অস্তিত্ব থাকা আর বাস্তবে চাঁদ দেখা এক বিষয় নয়। অনেক সময় চাঁদ আকাশে থাকলেও তা দেখা যায় না- মেঘ, আলো বা দিগন্তের অবস্থার কারণে। তাই বৈজ্ঞানিক হিসাব আমাদের চাঁদ থাকার সম্ভাবনার কথা জানাতে পারে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে দেখা যাবে কি না, তা বলে দিতে পারে না। এজন্যই শরিয়তে চূড়ান্ত ভিত্তি ধরা হয়েছে চাঁদ দেখা, কেবল হিসাব নয়।

সাক্ষ্য যাচাইয়ে বিজ্ঞানের সহায়ক ভূমিকা

সমসাময়িক অনেক আলেমের মতে, জ্যোতির্বিজ্ঞান চাঁদের অবস্থান ও উদয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে। এই তথ্য চাঁদ দেখার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে, যদি নির্ভরযোগ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানান যে, কোনো নির্দিষ্ট দিনে চাঁদের অবস্থান এমন যে তা দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, অথচ কেউ চাঁদ দেখার দাবি করে, তাহলে সেই সাক্ষ্য যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্যকে ‘সহায়ক’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আধুনিক ফতোয়া অনুসারে, নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে প্রয়োজনে এমন বিতর্কিত সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করাও সম্ভব হতে পারে। (ইনআমুল বারি: ৫/৪৯৫, তাসহিলুল ফলকিয়াত: ২৪৭)

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ২০, দেশে ২১ মার্চ ঈদের সম্ভাবনা; শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

জাতীয় ঐক্য ও হেলাল কমিটির সিদ্ধান্ত

চাঁদ দেখা নিয়ে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা বা সামাজিক বিভেদ সৃষ্টি না হয়, সেজন্য রাষ্ট্রীয় ‘জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি’ বা ‘হেলাল কমিটি’র সিদ্ধান্ত মেনে চলা জরুরি। অভিজ্ঞ আলেম ও মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি যদি শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী ঘোষণা দেয়, তা অনুসরণ করা সবার দায়িত্ব। এলাকাভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা এড়িয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ইসলামের শিক্ষার অন্যতম দাবি। (ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/১৬৭)

সংক্ষেপে বলা যায়, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চাঁদ সাব্যস্ত হবে এবং সেক্ষেত্রে টেলিস্কোপের সহায়তা নেওয়া জায়েজ। তবে কেবলমাত্র গাণিতিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে ইবাদতের সময় নির্ধারণ করা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তি এখানে শরয়ি সিদ্ধান্তকে নির্ভুল করতে ‘সহযোগী’ হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু তা প্রত্যক্ষ দর্শনের সুন্নাহসম্মত পদ্ধতির বিকল্প হবে না।