images

ইসলাম

জাকাত ও ফিতরা: শেষ মুহূর্তের জরুরি নির্দেশিকা

ধর্ম ডেস্ক

১৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

রমজান বিদায়ের পথে, দোরগোড়ায় ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দ যেন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, সেজন্য ইসলাম ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করেছে। শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োয় কোনো ভুল এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশিকা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ফিতরা: কেন এবং কখন দেবেন?

ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর মূলত রোজার ভুল-ত্রুটি দূর করে রোজাদারকে পবিত্র করার এবং দরিদ্রদের ঈদের খাবারের ব্যবস্থা করার একটি মাধ্যম। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) ফিতরাকে অপরিহার্য করেছেন রোজাদারের অনর্থক কথাবার্তা ও কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবীদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে। (সুনান আবু দাউদ: ১৬০৯)

ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা আদায় করা সুন্নাহ। তবে অভাবীরা যেন সময়মতো ঈদের কেনাকাটা বা খাবারের আয়োজন করতে পারে, তাই দুয়েকদিন আগে দিয়ে দেওয়া উত্তম।
পরিমাণ: ফিতরা সাধারণত খাদ্যদ্রব্য (গম, চাল, খেজুর ইত্যাদি) দিয়ে দিতে হয়। তবে, সুবিধা ও সহজ বিবেচনায় এটা অর্থমূল্যেও পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে। এ বছর ফিতরা ইসলামিক ফাউন্ডেশন নির্ধারিত বা স্থানীয় আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী সর্বনিম্ন পরিমাণের অর্থমূল্যে (প্রায় ১১০–১১৫ টাকা) প্রদান করা যাবে।

আরও পড়ুন: এবারও জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা

২. জাকাত: মূলনীতি ও সঠিক হিসাব

জাকাত কেবল দান নয়, এটি ধনীদের সম্পদে অভাবীদের সুনির্দিষ্ট অধিকার। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা জারিআত: ১৯)
নিসাব ও পরিমাণ: কারো কাছে যদি সাড়ে ৭ তোলা (৮৭.৪৫ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা (৬১২.৩৫ গ্রাম) রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য এক বছর পূর্ণ হয়, তবে মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ (৪০ ভাগের ১ ভাগ) জাকাত দিতে হবে।
ফিকহ পরামর্শ: বর্তমান বাজারে স্বর্ণ ও রুপার মূল্যের অনেক পার্থক্য। তাই আলেমদের মতে রুপার নিসাব (সাড়ে ৫২ তোলা) অনুসরণ করে জাকাত হিসাব করা গরিবদের জন্য বেশি উপকারী; এতে জাকাতদাতার সংখ্যা বাড়ে এবং বেশি মানুষ উপকৃত হয়।

৩. জাকাত ও ফিতরা পাওয়ার হকদার কারা?

সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে জাকাত ও ফিতরা ব্যয়ের ৮টি খাতের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু হলো-

  • ফকির (নিঃস্ব)
  • মিসকিন (প্রয়োজনের তুলনায় সম্পদ কম)
  • ঋণী ব্যক্তি (যিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম)
  • মুসাফির (সফরে গিয়ে অর্থাভাবে বিপদগ্রস্ত)

আরও পড়ুন: জাকাত কাকে দেওয়া যাবে, কাকে যাবে না?

কাকে দেওয়া যাবে না: জাকাত বা ফিতরা নিজের ঊর্ধ্বতন (বাবা, মা, দাদা, দাদী) এবং নিম্নতন (ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি) আত্মীয়দের দেওয়া যায় না। এছাড়া নিজের স্ত্রীকেও জাকাত দেওয়া যাবে না। তবে অভাবী ভাই, বোন, চাচা, ফুফু বা অন্যান্য আত্মীয়দের জাকাত দেওয়া কেবল জায়েজই নয়, বরং উত্তম।

৪. শেষ মুহূর্তের কিছু জরুরি টিপস

নগদ টাকাকে প্রাধান্য দিন: শাড়ি বা লুঙ্গি দেওয়ার চেয়ে নগদ টাকা দেওয়া বেশি কার্যকর। এতে অভাবী মানুষটি তার নিজের প্রয়োজন (যেমন: সন্তানদের পোশাক বা প্রয়োজনীয় ওষুধ) মেটাতে পারেন।
মর্যাদা বজায় রাখুন: জাকাত বা ফিতরা কোনো করুণা নয়, এটি ইবাদত। তাই লোকদেখানো প্রদর্শনী বা বড় লাইন না করে মানুষের মর্যাদা বজায় রেখে গোপনে তাঁদের কাছে হক পৌঁছে দেওয়া উত্তম।
সময় সচেতনতা: ফিতরা অবশ্যই ঈদের নামাজের আগে দিতে হবে। নামাজের পর দিলে তা সাধারণ দান হিসেবে গণ্য হবে, ফিতরা হিসেবে নয়।

শেষকথা, জাকাত ও ফিতরা কেবল দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি নয়, এটি সাম্য ও সামাজিক সুবিচারের এক অনন্য পদ্ধতি। আমরা যদি সঠিক নিয়মে এবং সঠিক সময়ে এই আর্থিক ইবাদতগুলো আদায় করি, তবেই ঈদের আনন্দ প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাবে। আল্লাহ আমাদের সবার জাকাত ও ফিতরা কবুল করুন। আমিন।