ধর্ম ডেস্ক
১৩ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
মুমিন মুসলমানের জীবনে ইবাদতের বসন্তকাল হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর মদিনার জীবনে রমজানের শেষ দশক নিয়মিত ইতিকাফ করতেন এই দশকের একটি বিশেষ রাত অন্বেষণের জন্য। সেই রাতটিই হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রজনী। এটি উম্মতে মুহাম্মদির জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক অনন্য উপহার। এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব ও গুনাহ মাফের বার্তা নিয়ে আসে।
আল্লাহ তাআলা এই রাতের মর্যাদা সম্পর্কে কোরআনুল কারিমে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা নাজিল করেছেন- ‘সুরা কদর’। এই সুরায় আল্লাহ তাউলা প্রশ্ন ও উত্তর উভয় মাধ্যমেই এই রাতের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন।
হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।’ (সুরা কদর: ৩)। অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাস বা ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদতের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
শান্তি ও নিরাপত্তার রাত: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এই রাতে ফেরেশতাগণ ও জিবরাইল তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। এই রাত পুরোপুরি শান্তি, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সুরা কদর: ৪-৫) অর্থাৎ, এই রাতে আল্লাহর অসংখ্য ফেরেশতা এবং জিবরাইল (আ.) তাঁর নির্দেশে প্রতিটি হুকুম বা সিদ্ধান্ত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন।
আরও পড়ুন: শবে কদর অনুসন্ধান: আমল, দোয়া ও আলামত
এই রাতে ইবাদতের মাধ্যমে পাপ মোচনের বিষয়ে নবীজি (স.) নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, আল্লাহ তাআলা তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০১)
নবীজি (স.)-এর উপরোক্ত হাদিস বিশ্লেষণ করলে ক্ষমা পাওয়ার জন্য দুটি বিশেষ শর্ত ফুটে ওঠে-
১. ঈমানের সাথে (ঈমানান): ইবাদতকারীকে অবশ্যই মুমিন হতে হবে এবং তার আকিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস সঠিক হতে হবে। শিরক বা অন্যান্য অপবিশ্বাস অন্তরে থাকলে সে লাইলাতুল কদরের বরকত থেকে বঞ্চিত হবে।
২. একনিষ্ঠতা ও বিশুদ্ধ নিয়ত (ইহতিসাব): ইবাদতকারীর নিয়ত সঠিক হতে হবে। যদি নিয়তের মধ্যে রিয়া, লোকদেখানো বা পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য থাকে, তবে সারা রাত জেগে ইবাদত করা কোনো কাজে আসবে না। ইবাদতের উদ্দেশ্য হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রতিদান লাভ।
আরও পড়ুন: শবে কদরে অন্তত ৪ আমল ছেড়ে দেবেন না
শবে কদরে গুনাহ মাফ হওয়া নিয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী-
সগিরা গুনাহ: হাদিসে গুনাহ মাফের যে কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা সাধারণত ‘সগিরা’ বা ছোট গুনাহ উদ্দেশ্য। আমল ও ইবাদতের বরকতে এগুলো সরাসরি মাফ হয়ে যায়।
কবিরা গুনাহ: বড় গুনাহ বা কবিরা গুনাহ মাফ করানোর জন্য আলাদাভাবে লজ্জিত হয়ে আন্তরিক ‘তওবা’ ও ‘ইস্তেগফার’ করা আবশ্যক।
বান্দার হক (হুকুকুল ইবাদ): মানুষের অধিকার সম্পর্কিত গুনাহ মাফ পেতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক আদায় করতে হবে অথবা তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। শুধু নফল ইবাদত দ্বারা বান্দার হকের গুনাহ মাফ হয় না।
আরও পড়ুন: লাইলাতুল কদরের তারিখ গোপন রাখার রহস্য ও তাৎপর্য
লাইলাতুল কদরে ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নবীজি (স.) এ রাতে পড়ার জন্য একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন-
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। কাজেই হে দয়াময়, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। (ইবনে মাজাহ: ২৮৪৭/৩৮৫০)
নবীজি (স.) নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি, যাতে বান্দা শেষ দশকের প্রতিটি রাতে ইবাদতে সচেষ্ট থাকে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাত)।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৭)
উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (স.) একবার নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে বের হয়েছিলেন, কিন্তু দুজন মুসলিমের ঝগড়ার কারণে সেই তারিখের নির্দিষ্ট জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হয় (সহিহ বুখারি: ২০২৩)। মূলত এর মধ্যে উম্মতের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে যাতে তারা পুরো দশক ইবাদতে মগ্ন থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, শবে কদর হলো গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ রজনী। ঈমান ও একনিষ্ঠ নিয়তের সঙ্গে এ রাতে ইবাদত করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। তবে মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এতে সাধারণত সগিরা গুনাহ মাফ হয়, আর কবিরা গুনাহের জন্য আন্তরিক তওবা করা আবশ্যক।