ধর্ম ডেস্ক
১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
পবিত্র রমজান মাস মুমিন জীবনের জন্য এক অনন্য আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণকাল। দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযম, সিয়াম সাধনা এবং বিশেষ ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে একজন মুমিন নিজের জীবনকে শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেন। তবে রমজান শেষে সেই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো ধরে রাখাই হলো বড় চ্যালেঞ্জ।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন কোনো অভ্যাস স্থায়ীভাবে গড়ে উঠতে ২১ থেকে ৬৬ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। সেই হিসেবে রমজানের ৩০ দিনের নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন মানুষের মস্তিষ্ককে একটি ইতিবাচক রুটিনে অভ্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে রমজানের সেই আলোকময় শিক্ষাগুলো সারা বছর ধরে রাখার কিছু কৌশল ও বিধান নিচে আলোচনা করা হলো।
রোজার মূল লক্ষ্যই হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে... যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩) ৩০ দিন অন্যায় থেকে দূরে থাকার ফলে মস্তিষ্কে যে স্নায়বিক পরিবর্তন (Neuroplasticity) ঘটে, তা আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়। রমজান পরবর্তী জীবনে এই তাকওয়া ধরে রাখাই হলো সার্থকতা।
আরও পড়ুন: পবিত্র রমজানের মর্যাদা ও বিশেষত্ব
রমজান ও কোরআনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। হাদিসে এসেছে, নবীজি (স.) বলেছেন, ‘কোরআন ও রোজা কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।’ (মুসনাদে আহমদ)। রমজানে কোরআন তেলাওয়াতের যে জোয়ার তৈরি হয়, তা ঈদের পরেও ধরে রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৫-১০টি আয়াত অর্থসহ পড়ার অভ্যাস করা উচিত। এতে কোরআনের শিক্ষা জীবনের স্থায়ী পাথেয় হয়ে থাকবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) এই মাসে অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দান-সদকা করতেন এবং একে ‘সহমর্মিতার মাস’ বলতেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।’ (সুরা হাশর: ৯) রমজানে আমরা যেভাবে গরিব-অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছি, এই মানবিকতা যেন কেবল রমজানে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছরের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়।
হাদিসে রমজানকে ‘ধৈর্যের মাস’ বলা হয়েছে। রোজা মানুষকে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও আত্মসংযমী হতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেউ রোজাদারকে গালি দিলে সে যেন বলে- আমি রোজাদার।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৪) রমজান পরবর্তী জীবনেও যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেননা আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই থাকেন।
আরও পড়ুন: রমজানে ১৩ আমলের ফজিলত সবচেয়ে বেশি
রোজা এমন এক গোপন ইবাদত, যার প্রকৃত অবস্থা কেবল আল্লাহই জানেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি) এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, আমাদের প্রতিটি কাজ যেন লোকদেখানো না হয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য (ইখলাস) হয়।
রমজান মুসলিম সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৩) ইফতার বা জামাতে নামাজের মাধ্যমে যে সামাজিক ঐক্য তৈরি হয়, তা ঈদের পরেও ধরে রাখা জরুরি।
১. পরিচয় পরিবর্তন: নিজেকে কেবল ‘রমজানের ইবাদতকারী’ হিসেবে নয়, বরং ‘একজন আমলকারী মুমিন’ হিসেবে নিজের পরিচয় মস্তিস্কে প্রতিষ্ঠিত করুন। এটি স্থায়ী পরিবর্তনে সহায়তা করে।
২. সহায়ক পরিবেশ: কোরআন শরিফ বা জায়নামাজ এমন স্থানে রাখুন যেখানে সহজে চোখ পড়ে। দৃশ্যমান সংকেত মানুষকে ইবাদতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
৩. শাওয়ালের ছয় রোজা: রমজানের রেশ ধরে রাখতে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’ হিসেবে কাজ করে।
রমজান আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায় যে, আমরা চাইলে একটি সুশৃঙ্খল ও পাপাচারমুক্ত জীবন যাপন করতে পারি। রমজান বিদায় নিলেও যেন এর সুফলগুলো আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে না যায়। ইবাদতের ধারাবাহিকতা বা ‘ইস্তেকামাত’ বজায় রাখাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের শিক্ষা সারা বছর জীবনে ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।