ধর্ম ডেস্ক
১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
লাইলাতুল কদর বা শবে কদর ইসলামের সবচেয়ে মহিমান্বিত রাত। এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই রাতেই মানবজাতির হিদায়াতের গ্রন্থ পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। কোরআনুল কারিমের একাধিক স্থানে এই রাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা কদর: ১-৩) অন্য আয়াতে আল্লাহ এই রাতকে ‘বরকতময় রাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (সুরা দুখান: ৩)
তবে এই রাতটি রমজানের ঠিক কততম তারিখ তা কোরআন বা হাদিসে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। মহিমান্বিত এই রাতের তারিখ গোপন রাখার পেছনে রয়েছে গভীর রহস্য ও মহান আল্লাহর বিশেষ হেকমত।
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ফখরুদ্দীন রাযি (রহ.) তাঁর ‘তাফসিরুল কাবির’-এ লাইলাতুল কদর গোপন রাখার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হেকমত বা রহস্য উল্লেখ করেছেন-
১. ইবাদতে নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ প্রদান: আল্লাহ তাআলা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোপন রেখেছেন যাতে বান্দা সর্বদা অনুসন্ধিৎসু থাকে এবং বেশি ইবাদত করে। যেমন ইবাদতের মধ্যে তাঁর সন্তুষ্টি, দোয়ার মধ্যে কবুল হওয়ার বিশেষ মুহূর্ত এবং ইসমে আজম গোপন রাখা হয়েছে। একইভাবে লাইলাতুল কদর গোপন রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ কেবল এক রাতের ওপর ভরসা না করে রমজানের প্রতিটি রাতেই ইবাদতে মনোযোগী হয়।
আরও পড়ুন: শবে কদরে যেভাবে ইবাদত করবেন
২. অধিক গুনাহ থেকে সুরক্ষা: যদি লাইলাতুল কদরের রাত নির্দিষ্ট থাকত, তবে কোনো দুর্ভাগা মানুষ যদি সেই নির্দিষ্ট রাতে গুনাহে লিপ্ত হতো, তবে তা আল্লাহর কাছে চরম ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য হতো। জেনে-শুনে মহিমান্বিত রাতে পাপ করা সাধারণ পাপের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। তাই বান্দার প্রতি দয়া করেই আল্লাহ এ রাতকে গোপন রেখেছেন।
৩. অনুসন্ধানের সওয়াব দান: মানুষ যখন নির্দিষ্ট রাতটি জানে না, তখন সে পাওয়ার আশায় একাধিক রাত জেগে ইবাদত করে। এই অনুসন্ধান ও প্রচেষ্টা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। মুমিনের এই ব্যাকুলতা ও চেষ্টার জন্য আল্লাহ তাআলা তাকে অতিরিক্ত সওয়াব ও মর্যাদা দান করেন।
৪. প্রতিটি রাতকে মূল্যবান করে তোলা: লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট না থাকায় মুমিনরা রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও নফল নামাজে মগ্ন থাকে। এই অনিশ্চয়তাই মূলত পুরো রমজান মাসকে আধ্যাত্মিক আমেজে ভরপুর করে তোলে।
আরও পড়ুন: শবে কদর নিয়ে যে 'ভুল' আমরা প্রতিবছর করি
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোযোগী হতে এবং লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ২০২০)
উবাদা ইবনু সামিত (রা.) হতে বর্ণিত, একদা নবী (স.) আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলিম ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন- আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবত এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। (সহিহ বুখারি: ২০২৩) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৭)
লাইলাতুল কদর শুধু রাত জাগার নাম নয়; এটি তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ। তাই নির্দিষ্ট কোনো তারিখের অপেক্ষা না করে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে—২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতে এবং সম্ভব হলে প্রতিটি রাতেই বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াতে সময় কাটানোই একজন মুমিনের জন্য উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জন করার এবং এই মহিমান্বিত রাতের বরকত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।