images

ইসলাম

জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ারর ‘ঐশী প্রজ্ঞা’

ধর্ম ডেস্ক

১০ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। এই পথের প্রতিটি মোড়ে আমাদের সামনে আসে দুটি বিপরীতমুখী আহ্বান। একটি ডাকে সংকীর্ণতা ও ভয়ের দিকে, অন্যটি দেখায় আল্লাহর অসীম দয়া ও প্রশস্ততার পথ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২৬৮ ও ২৬৯ নম্বর আয়াতে এই চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।

কোরআনের অমিয় বাণী

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা: ২৬৮)

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত (প্রজ্ঞা) দান করেন। আর যাকে হিকমত প্রদান করা হয়, সে অবশ্যই প্রভূত কল্যাণ লাভ করে। তবে কেবল বিবেকবান ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা বাকারা: ২৬৯)

আরও পড়ুন: দুঃখ-দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেওয়ার মতো কিছু আয়াত

শয়তানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

মানুষ যখনই কোনো মহৎ কাজ বা দান-সদকার সংকল্প করে, তখনই শয়তান তার মনে ‘দারিদ্র্যের আতঙ্ক’ ঢুকিয়ে দেয়। সে প্ররোচনা দেয়- ‘এখন এই অর্থ ব্যয় করলে ভবিষ্যতে সংকটে পড়বে না তো?’ শয়তানের এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে কৃপণতায় অভ্যস্ত করা। কারণ কৃপণতা থেকেই জন্ম নেয় চরম স্বার্থপরতা ও সামাজিক অবক্ষয়। এ বিষয়ে সতর্ক করে বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা এই কৃপণতার কারণেই ধ্বংস হয়েছিল।’ (সহিহ মুসলিম)

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি: ক্ষমা ও বরকত

শয়তান যেখানে শূন্যতার ভয় দেখায়, আল্লাহ সেখানে দেন অসীম পূর্ণতার আশ্বাস। তিনি মুমিনদের জন্য দুটি বিশেষ পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন: ‘মাগফিরাত’ (ক্ষমা) এবং ‘ফজল’ (অনুগ্রহ)। মুমিন যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, তখন কেবল তার সম্পদই পবিত্র হয় না, বরং তার যাপিত জীবনের গুনাহগুলোও মোচন হয়।
দান করলে সম্পদ কমে যায় না—এই অমোঘ সত্যটি হাদিসেও বারবার এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সদকা করলে কখনও সম্পদ কমে না।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ, দৃশ্যত সম্পদ কমছে মনে হলেও আল্লাহ তাতে এমন বরকত দান করেন, যা মানুষের কল্পনার অতীত।

আরও পড়ুন: কোরআনের যে সুরাগুলো বেশি পড়বেন

হিকমাহ: জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ

হিকমাহ বা প্রজ্ঞা হলো এমন এক ঐশী আলো, যা মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়। একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি জানেন যে, পার্থিব এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই প্রকৃত সফলতা। এই প্রজ্ঞা মানুষকে সংকটে ধৈর্যশীল এবং প্রাচুর্যে বিনয়ী হতে শেখায়। কোরআনের ভাষায়, যাকে হিকমত দেওয়া হয়েছে তাকে ‘খাইরুন কাসীর’ বা প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে। এটি কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক গভীর উপলব্ধি।

আমাদের করণীয়

শয়তানের নেতিবাচক চিন্তা থেকে বাঁচতে আল্লাহর ওপর ‘তাওয়াক্কুল’ বা ভরসা বাড়ানো জরুরি। যখনই মনে অভাবের ভয় আসবে, বুঝতে হবে এটি শয়তানের ধোঁকা। প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে এই আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা।

শয়তানের দেখানো অভাবের ভয় নাকি আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি—কোনটি আমরা বেছে নেব? এই সঠিক সিদ্ধান্তই আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করবে। প্রজ্ঞার দাবি হলো, সাময়িক ভয়ের কাছে নতিস্বীকার না করে আল্লাহর অসীম রহমতের ওপর অবিচল আস্থা রাখা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকৃত হিকমাহ অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।