ধর্ম ডেস্ক
০৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
পবিত্র রমজান মাসে ইবাদতের বিশুদ্ধতা নিয়ে মুমিনরা অত্যন্ত সতর্ক থাকেন। তবে আধুনিক প্রসাধন সামগ্রী ও সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে। বিশেষ করে পারফিউমে অ্যালকোহল থাকা কিংবা লিপস্টিক ব্যবহারে রোজা ভেঙে যায় কি না এমন প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে। ইসলামি শরিয়ত ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
রোজা অবস্থায় আতর বা পারফিউম ব্যবহার করা জায়েজ। বরং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাহসম্মত কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) সুগন্ধি পছন্দ করতেন এবং কেউ সুগন্ধি উপহার দিলে তা সাদরে গ্রহণ করতেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় নবীদের সুন্নাহ- সুগন্ধি ব্যবহার, বিয়ে, মেসওয়াক করা এবং লজ্জাস্থান আচ্ছাদন করা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৭৮)
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ’ জানিয়েছে, রোজা অবস্থায় শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হয় না। তবে আগরবাতি বা ধোঁয়াযুক্ত সুগন্ধি সরাসরি নাকের কাছে নিয়ে গভীর শ্বাস টেনে শোঁকা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ ধোঁয়ার কণা গলার ভেতরে পৌঁছালে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। (ফতোয়া লাজনাতিদ্দায়িমা: ১০/২৭১)
আরও পড়ুন: রমজানে সতর্কতা: যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়
অনেকে মনে করেন, পারফিউমে অ্যালকোহল থাকলে তা ‘নাপাক’ হয়ে যায় এবং তা মেখে নামাজ পড়া যাবে না। তবে ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিষয়টি সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। হানাফি মাজহাবের ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতানুযায়ী, যদি অ্যালকোহল আঙুর বা খেজুর থেকে প্রস্তুত না হয়, তাহলে তা সুগন্ধি বা ওষুধের মতো বৈধ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ অ্যালকোহল শস্য বা রাসায়নিক উপাদান থেকে তৈরি হওয়ায় অনেক আলেম একে নাপাক মনে করেন না। ফলে এ জাতীয় পারফিউম ব্যবহার করলে কাপড় নাপাক হয় না এবং ওই কাপড়ে নামাজ পড়াও বৈধ। (রদ্দুল মুখতার: ৩/৩৬৫)
রোজা অবস্থায় মুখে মেকআপ, ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করলেও রোজা ভাঙে না। কারণ এগুলো চামড়ার ওপর ব্যবহৃত হয় এবং তা সরাসরি পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না। ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে কোনো কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছালে তবেই রোজা ভঙ্গ হয়। চামড়ার রোমকূপ দিয়ে কোনো কিছু শোষিত হওয়া রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।
আরও পড়ুন: রোজা রেখে তরকারির স্বাদ নেওয়া যাবে?
লিপস্টিক বা লিপবাম ঠোঁটে লাগানো অবস্থায় যদি তা জিহ্বা দিয়ে চেটে গিলে ফেলা হয় এবং তার স্বাদ গলায় পৌঁছে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। এ কারণে রোজা অবস্থায় লিপস্টিক এড়িয়ে চলা বা সতর্ক থাকা জরুরি। তবে শুধু ঠোঁটে লাগিয়ে রাখলে রোজা ভাঙবে না।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, চোখে সুরমা বা আইড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভাঙে না। চোখের সঙ্গে পাকস্থলীর সরাসরি কোনো সংযোগ না থাকায় সুরমার স্বাদ গলায় অনুভূত হলেও এটি রোজা নষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হয় না। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/২০৩)
ইসলামি স্কলারদের মতে, রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং গুনাহ থেকে দূরে থাকাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রসাধনী ব্যবহার বৈধ হলেও রোজার মূল লক্ষ্য আত্মসংযম ও তাকওয়া অর্জন করা। কোনো প্রকার লৌকিকতা পরিহার করে সতর্কতার সাথে ইবাদত পালন করাই মুমিনের দায়িত্ব।