ধর্ম ডেস্ক
০২ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
দাম্পত্য সম্পর্ক ইসলামে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। ভালোবাসা, দায়িত্ব ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সম্পর্কের ভেতরে যখন অহেতুক সন্দেহ ঢুকে পড়ে, তখন শুরু হয় এক নীরব দূরত্ব। বর্তমান সময়ে সেই দূরত্বের একটি বড় অনুঘটক হলো-স্বামী বা স্ত্রীর মোবাইল ফোন বিনা অনুমতিতে পরীক্ষা করা। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, জীবনসঙ্গী হওয়ার সুবাদে কি অপরজনের ব্যক্তিগত মেসেজ বা ফোন কল চেক করার নিরঙ্কুশ অধিকার তৈরি হয়? শরিয়ত ও দাম্পত্য নৈতিকতার আলোকে এর একটি সুনিশ্চিত দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি হলো- কোনো মানুষের গোপনীয়তা অকারণে অনুসন্ধান করা বৈধ নয়। একে কোরআনের পরিভাষায় ‘তাজাসসুস’ বা গোয়েন্দাগিরি বলা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ এবং তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২)
বিখ্যাত মুফাসসির ও ফকিহগণ এই আয়াতের সাধারণ মূলনীতির আলোকে বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল অপরিচিতের জন্য নয়, বরং নিকটতম সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ রয়েছে। স্বামী–স্ত্রী হওয়া মানেই একজনের ব্যক্তিগত পরিসরে অন্যজনের জোরপূর্বক প্রবেশের অধিকার পাওয়া নয়।
আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রীর সংসারে বদনজর, রুকইয়ার পদ্ধতি কী
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৪৩)
ফকিহগণ ‘তাজাসসুস’ নিষিদ্ধ হওয়ার এই মূলনীতির আলোকে বলেন, স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যেও একটি পারস্পরিক সীমারেখা বা ‘হুদুদ’ আছে। জীবনসঙ্গী হওয়া মানেই অপরজনের প্রতিটি ব্যক্তিগত কথোপকথনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করার লাইসেন্স নয়।
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.)-এর দর্শনে পাওয়া যায় যে, সংসারে শান্তি টিকে থাকে বিশ্বাসের মাধ্যমে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে নয়। তাঁর মতে, অহেতুক সন্দেহ থেকে জন্ম নেওয়া অনুসন্ধান অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে অবিশ্বাসে পরিণত করে।
অন্যদিকে, মোবাইল ফোন আজকের সময়ে মানুষের ‘ব্যক্তিগত ডায়েরি’র মতো। এতে থাকতে পারে ব্যক্তিগত প্রার্থনা, আবেগ, দুর্বলতা কিংবা একান্ত চিন্তা। অনুমতি ছাড়া এগুলো দেখা পারস্পরিক আমানতের পরিপন্থী আচরণ বলে গণ্য হতে পারে। ইমাম ইবনু তাইমিয়ার আলোচনাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি পাওয়া যায় যে, যে কাজ বাহ্যিকভাবে সত্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে করা হয়, কিন্তু তা যদি ভেতরে বড় কোনো ফিতনা বা বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তবে তা কল্যাণকর নয়।
আরও পড়ুন: স্বামী যেমন হওয়া উচিত
তবে ইসলাম বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। যদি কোনো সঙ্গীর মধ্যে স্পষ্ট প্রতারণা বা শরিয়ত পরিপন্থী কাজের অকাট্য আলামত দেখা যায়, তবে পরিবারকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এটি যেন অভ্যাসে পরিণত না হয়। সংশয় দূর করার প্রথম এবং অপরিহার্য পথ হলো- খোলামেলা আলোচনা। গোপনে মোবাইল চেক করে সত্য পাওয়া গেলেও অধিকাংশ সময় সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না, কারণ বিশ্বাসের ভিত্তিটি ততক্ষণে দুর্বল হয়ে যায়।
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে নজরদারি নয়, বরং প্রশান্তির বন্ধন হিসেবে দেখতে চায়। যেখানে স্বামী–স্ত্রী একে অপরের কাছে নিরাপদ ও সম্মানিত। অনুমতি ছাড়া মোবাইল দেখা শুধু একটি প্রযুক্তিগত অনধিকার প্রবেশ নয়, এটি বিশ্বাসের দরজায় এক নীরব আঘাত। যে সংসারে খোদাভীতি বা ‘তাকওয়া’ আছে, সেখানে মোবাইলের পাসওয়ার্ডের চেয়ে হৃদয়ের স্বচ্ছতাই বেশি জরুরি। সম্পর্ক টিকে থাকে পাহারাদারিতে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আমানত রক্ষায়।