images

ইসলাম

রমজানে সতর্কতা: যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়ে যায়

ধর্ম ডেস্ক

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম

পবিত্র রমজান আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই রোজার একমাত্র দাবি নয়; বরং এর পূর্ণ সওয়াব ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা বজায় রাখতে যাবতীয় মাকরুহ (অপছন্দনীয়) কাজ থেকেও বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়।

হাদিসে এসেছে, ‘রোজা হলো ঢাল।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৪) অন্য বর্ণনায় একে ‘সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে (মুসনাদে আহমাদ)। নির্ভরযোগ্য ফিকহগ্রন্থসমূহের (যেমন: ফতোয়ায়ে শামি, আলমগিরি) আলোকে রোজার সওয়াব অটুট রাখার স্বার্থে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, তা নিচে তুলে ধরা হলো-

১. অজু ও পরিচ্ছন্নতায় অসতর্কতা

রোজা অবস্থায় গড়গড়াসহ কুলি করা এবং নাকের গভীরে পানি পৌঁছানো মাকরুহ। কারণ এতে অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি ভেতরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তুমি ভালোভাবে অজু করো এবং নাকের গভীরে পানি পৌঁছাও, যদি না তুমি রোজাদার হও।’ (সুনানে নাসায়ি: ৮৭) তবে শরীর ঠান্ডা করার জন্য মাথায় পানি দেওয়া বা স্বাভাবিক গোসল করা জায়েজ।

আরও পড়ুন: রোজা ভেঙে যাওয়া নিয়ে ৩০ ভুল ধারণা অনেকেরই আছে

২. বিনা প্রয়োজনে স্বাদ গ্রহণ

কোনো কারণ ছাড়াই খাবারের স্বাদ নেওয়া বা কোনো কিছু চিবানো মাকরুহ। এটি পানাহারের সাদৃশ্য তৈরি করে এবং অসতর্কতায় পেটে চলে যাওয়ার ভয় থাকে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন শিশু বা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য খাবার প্রস্তুত করতে হলে) জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে লবণের স্বাদ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা ফেলে দিলে রোজা মাকরুহ হবে না। (সূত্র: ফতোয়ায়ে শামি)

৩. টুথপেস্ট ও মাজনের ব্যবহার

রোজা অবস্থায় মিসওয়াক করা সুন্নাহ। তবে টুথপেস্ট বা ঝাঁজযুক্ত মাজন ব্যবহারের সময় যদি এর কণা বা স্বাদ গলায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা মাকরুহ। আধুনিক ফুকাহায়ে কেরামের মতে, ঝুঁকি এড়াতে দিনের বেলা পেস্ট ব্যবহার পরিহার করাই শ্রেয়। উল্লেখ্য, পেস্টের কোনো অংশ ভেতরে চলে গেলে রোজা ভেঙে যাবে।

৪. নৈতিক পতন ও সওয়াবহানি

মিথ্যা বলা, গিবত (পরনিন্দা), গালিগালাজ ও অশ্লীল আচরণ—এসব কাজ ইসলামের দৃষ্টিতে সরাসরি হারাম। এগুলো রোজা ভঙ্গ না করলেও রোজার আধ্যাত্মিক প্রভাব ও সওয়াব মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী আমল পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৩) অতএব, এগুলো কেবল আইনগত মাকরুহ না হলেও রুহানিয়াতের জন্য চূড়ান্ত ক্ষতিকর।

আরও পড়ুন: গোসলের সময় নাকে পানি ঢুকলে রোজা ভেঙে যাবে?

৫. সাহরির সময়জ্ঞান ও সওমে বিসাল

সাহরি শেষ সময়ে খাওয়া সুন্নাহ, তবে সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা হলে সতর্কতাবশত পানাহার বন্ধ করা আবশ্যক। এছাড়া ইফতার না করে টানা একাধিক দিন রোজা রাখা (সওমে বিসাল) উম্মতের জন্য অপছন্দনীয় ও নিষিদ্ধ।

৬. দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা

যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকে এবং বীর্যপাত বা রোজা ভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে স্ত্রীকে চুম্বন বা স্পর্শ করা মাকরুহ। তবে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকলে তা জায়েজ। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (স.) রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করতেন; তবে তিনি ছিলেন সর্বাপেক্ষা আত্মনিয়ন্ত্রিত। (সহিহ মুসলিম: ১১০৬)

৭. শরীর অতিরিক্ত দুর্বল করা

হানাফি মাজহাবমতে, হিজামা বা রক্ত দানে রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে এর ফলে যদি রোজাদার অত্যধিক দুর্বল হয়ে পড়েন এবং রোজা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা মাকরুহ। (সূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ২/৪১৮)

৮. মুসাফিরের রোজা

সফরে যদি রোজা রাখা কষ্টকর না হয়, তবে রোজা রাখাই উত্তম। কিন্তু যদি রোজা রাখা অতিরিক্ত কষ্টসাধ্য বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে শরিয়তের দেওয়া ছাড় (রুখসত) গ্রহণ না করা মাকরুহ। আর যদি ক্ষতির আশঙ্কা প্রবল হয়, তবে রোজা রাখা গুনাহ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। এমতাবস্থায় রোজা না রেখে পরবর্তী সময়ে কাজা আদায় করাই উত্তম। (সুরা বাকারা: ১৮৫)

রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি একটি সুসংহত আত্মিক প্রশিক্ষণ। কিছু কাজ রোজা ভঙ্গ না করলেও এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফিকহসম্মত সচেতনতার মাধ্যমে আমরা আমাদের রোজাকে একটি উচ্চমানের ইবাদতে পরিণত করতে পারি।