ধর্ম ডেস্ক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আজকাল রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অকারণ গালি শোনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় পাল্টা জবাব দেওয়া। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শন অনুযায়ী, অন্যায়ের জবাবে নীরব থাকা এক অপরাজেয় শক্তি। মুমিন যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চুপ থাকে, তখন ফেরেশতারা তার পক্ষে জবাব দিতে শুরু করেন।
অপমানের জবাবে নীরব থাকার ফজিলত সম্পর্কে একটি অর্থবহ ঘটনা হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবনীতে পাওয়া যায়। একদা রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের নিয়ে বসা ছিলেন, এ সময় এক লোক হজরত আবু বকর (রা.)-কে গালি দিলো এবং কষ্ট দিলো, কিন্তু আবু বকর (রা.) কোনো জবাব না দিয়ে চুপ রইলেন। পুনরায় সে আবু বকর (রা.)-কে গালি দিলো এবং কষ্ট দিলো, কিন্তু তিনি কোনো জবাব না দিয়ে চুপ রইলেন। তৃতীয়বার সে আবু বকর (রা.)-কে গালি ও কষ্ট দিলে এবার তিনি তার প্রতিশোধ নিলেন।
আবু বকর (রা.) যখন প্রতিশোধ নিলেন তখন রাসুলুল্লাহ (স.) উঠে দাঁড়ালেন। আবু বকর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন- আসমান থেকে একজন ফেরেশতা নেমেছিলেন এবং তোমার পক্ষ হয়ে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখন তুমি তার প্রতিশোধ নিলে তখন শয়তান এখানে উপস্থিত হয়েছে। শয়তান এখানে উপস্থিত হওয়ায় আমি আর বসতে পারি না।[ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৯৬)
আরও পড়ুন: নবীজির নির্দেশ পালনে সাহাবিদের ব্যাকুলতা
ঐশী সুরক্ষা: নীরব থাকার মাধ্যমে আপনি একজন ফেরেশতাকে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করলেন, যাদের জবাব মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
শয়তানের পরাজয়: ঝগড়া মূলত শয়তানের প্ররোচনা। আপনি তর্কে না জড়ালে শয়তান পরাজিত হয় এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সুযোগ পায় না।
ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য: পাল্টা গালি আপনাকে ওই ব্যক্তির স্তরেই নামিয়ে আনে, পক্ষান্তরে নীরবতা আপনাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উচ্চতায় আসীন করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই কৌশলকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ঘোষণা করেছেন। এরশাদ হয়েছে- ‘মন্দের বিপরীতে তা-ই করো যা উৎকৃষ্ট। ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৪)
আলেমদের মতে, গালির জবাবে শান্ত থাকাই সেই ‘উৎকৃষ্ট’ আচরণ, যা অনেক সময় শত্রুর হৃদয়কেও পরিবর্তন করে দেয়।
আরও পড়ুন: সাহাবিদের ৫ ব্যতিক্রমধর্মী আমল: যুগে যুগে অনুপ্রেরণা
আধুনিক মনোবিজ্ঞানেও ‘সাইলেন্স থেরাপি’ বা ‘রেসপন্স ম্যানেজমেন্ট’-কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, রাগের মাথায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখালে মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমে এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি হ্রাস পায়। ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই শিখিয়েছে যে, আত্মিক প্রশান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ধৈর্য’। রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন- ‘সেই ব্যক্তি শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)
অকারণে কেউ গালি দিলে চুপ থাকা মানে হেরে যাওয়া নয়; বরং এটি আল্লাহর ওপর গভীর আস্থার প্রতীক। পরের বার কেউ আপনাকে আঘাত করলে নীরবতা হোক আপনার শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদ এবং ফেরেশতাদের হাতে রাখুন আপনার ন্যায়সঙ্গত জবাব।