ধর্ম ডেস্ক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
ধূলামলিন পথ, দীর্ঘ যাত্রা আর ক্লান্ত শরীর- প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় দূর-দূরান্তের মুসাফিরদের প্রধান আশ্রয় ছিল ‘মুসাফিরখানা’। আধুনিক হোটেল বা রিসোর্ট সংস্কৃতির ভিড়ে আজ আমরা প্রায় ভুলেই গেছি সেই নিঃস্বার্থ আতিথেয়তার কথা। ইসলামি আতিথেয়তা ও মানবিকতার এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিদর্শন ছিল এই মুসাফিরখানাগুলো, যা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী।
ইসলামে মুসাফিরের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচুতে। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে মেহমানদারির সওয়াব হাসিলে মুসলিম শাসনামলে বাংলায় মুসাফিরখানা নির্মাণের সংস্কৃতি শুরু হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি)। এই আদর্শকে ধারণ করেই সওয়াবের আশায় সুলতান ও নবাবরা রাস্তার পাশে বা মসজিদের সন্নিকটে মুসাফিরখানা নির্মাণ করতেন।
মুঘল আমলে ঢাকার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে মুসাফিরখানার জৌলুস ছিল চোখে পড়ার মতো। তৎকালীন মুসাফিরখানা বা সরাইখানার রাজকীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল ‘কাটরা’। ঢাকার চকবাজার সংলগ্ন বড় কাটরা ও ছোট কাটরা ছিল মূলত সুদূর পারস্য বা মধ্য এশিয়া থেকে আসা বণিক ও পর্যটকদের জন্য বিশাল সেবাকেন্দ্র। পাশাপাশি সপ্তদশ শতাব্দীতে ঢাকার ফৌজদার নবাব ফারহাদ খান চকবাজার শাহী মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় মুসাফিরদের জন্য আশ্রয় ও লঙ্গরখানার বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন, যা তৎকালীন বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে আসা পথিকদের বড় ভরসা ছিল।
আঞ্চলিক পর্যায়েও এই আতিথেয়তার চিত্র ছিল অনন্য। সিলেটের শাহজালাল (রহ.) দরগাহ ও চট্টগ্রামের খানকাহগুলোতে পর্যটকদের জন্য ছিল উন্মুক্ত আতিথেয়তা। এমনকি আরমানিটোলা ও সূত্রাপুরের ধনাঢ্য পরিবারগুলোও তাদের বাড়ির নির্দিষ্ট অংশ মুসাফিরদের বিশ্রামের জন্য উৎসর্গ করতেন।
উদ্ভব: সুলতানি ও মুঘল আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সূচনা।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: নবাবী আমলে লঙ্গরখানা ও রক্ষী নিয়োগের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল কার্যক্রম।
স্থায়িত্ব: জমি ‘ওয়াকফ’ করে সেখান থেকে প্রাপ্ত আয়ে দীর্ঘমেয়াদী ব্যয়ভার বহন।
বিলুপ্তি: ব্রিটিশ আমলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক হোটেলের উত্থানে ঐতিহ্যের অবসান।
মুসাফিরখানা পরিচালনার জন্য সরকারি বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল না। দানশীল ব্যক্তিরা বিশাল ভূসম্পত্তি মুসাফিরখানার নামে ‘ওয়াকফ’ করে দিতেন। এই সম্পত্তির আয় থেকেই মেহমানদের আবাসন ও খাবারের ব্যয় মেটানো হতো। এটি ছিল ইসলামের একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল, যা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল।
বাংলার ‘মুসাফিরখানা’ কেবল ইটের দালান ছিল না, এটি ছিল মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল স্মারক। আজকের যান্ত্রিক যুগেও মুসাফিরখানার সেই মানবিক চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক শহরগুলোতে ‘কমিউনিটি কিচেন’ বা স্বল্পমূল্যে আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তুললে আমরা সেই নিঃস্বার্থ সেবা ও সামাজিক সহমর্মিতার ঐতিহ্যকে পুনরায় জীবিত করতে পারি।