ধর্ম ডেস্ক
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
রমজানের অন্যতম আনন্দময় মুহূর্ত হলো ইফতার। সারা দিন ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর থাকার পর মহান আল্লাহর নির্দেশে পানাহার শুরু করা রোজাদারের জন্য এক পরম প্রাপ্তি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইফতারের আয়োজনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ সংস্কৃতি ও অপচয়ের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয়োজন ও খাবার নষ্ট করা ইসলামের মূল চেতনার কতটা পরিপন্থী, তা ভেবে দেখা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইফতার ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি মূলত কয়েকটি তাজা বা শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তা না থাকলে সামান্য পানি পান করতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬)
অথচ আজকের সমাজে ইফতার এখন বিলাসিতা ও প্রদর্শনীর বিষয় হয়ে উঠেছে। পাঁচ তারকা হোটেল বা রাজকীয় আয়োজনে হাজার হাজার টাকার ইফতার পার্টি হচ্ছে, যেখানে খাবারের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়। অথচ সেই খাবারের ওপর ছিল অভুক্ত অনাহারী মানুষের অধিকার।
ইসলামে অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন- ‘তোমরা খাও ও পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)
আরও পড়ুন: আজান দেয়নি, শুধু ঘড়ি দেখে ইফতার করা কি ঠিক?
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা ইসরা: ২৭)
ইফতারে প্রয়োজনের বেশি আয়োজন করে খাবার নষ্ট করা মূলত আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জন এবং ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুভব করা। যদি ইফতারের টেবিলে আমরা শাহী আড়ম্বরে ডুবে যাই, তবে ক্ষুধার্তের প্রতি সহমর্মিতার শিক্ষা ম্লান হয়ে যায়। আলেমদের মতে, অতিরিক্ত ভোজন ও অপচয় ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট করে এবং অলসতা বৃদ্ধি করে, যা তারাবিহ ও রাতের ইবাদতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অনেক সময় ইফতার মাহফিলগুলো ইবাদতের চেয়ে সামাজিক মর্যাদা বা আভিজাত্য প্রদর্শনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ইসলামে যেকোনো ইবাদতে ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো মানসিকতা সওয়াব ধ্বংস করে দেয়। ইফতার হওয়া উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে, সামাজিক প্রতিযোগিতার নয়।
আরও পড়ুন: ইফতারের বরকতময় মুহূর্ত: কিছু মাসনুন আমল
ইফতারে অতিরিক্ত খরচ না করে সেই অর্থ দিয়ে অসচ্ছল রোজাদারকে ইফতার করানো গেলে তাতে অসাধারণ সওয়াব লাভ হয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে; তবে এতে রোজাদারের সওয়াব সামান্যও কম হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি: ৮০৭)
ইফতারের মাহাত্ম্য খাবারের আধিক্যে নয়, বরং হৃদয়ের আন্তরিকতা ও সুন্নাহর অনুসরণে। অপচয় ও আড়ম্বর পরিহার করে সাধারণ ইফতার করাই প্রকৃত তৃপ্তি ও সওয়াবের পথ। আসুন, রমজানের এই বরকতময় সময়ে বিলাসিতা ত্যাগ করি এবং ইফতারের প্রকৃত শিক্ষা জীবনে ধারণ করি।