ধর্ম ডেস্ক
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
শবে বরাত বা অর্ধ-শাবানের রাত মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষ রহমতের। এই রাতে মহান আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত পাওয়ার আশায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকেন। কিন্তু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি আমাদের সমাজে লক্ষণীয়- সারা রাত নফল ইবাদত করার পর যখন ফরজের সময় হয়, ঠিক তখনই অনেকে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে ফরজের জামাত তো বটেই, অনেক সময় ফজরের নামাজই কাজা হয়ে যায়। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এটি ইবাদতকারীদের জন্য শয়তানের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশল।
ইসলামি শরিয়তের অকাট্য মূলনীতি হলো- ফরজ রক্ষা করা হচ্ছে মূলধন, আর নফল হলো অতিরিক্ত মুনাফা। সারা রাত নফল ইবাদত করে ফজরের ফরজ নামাজ মিস করা মানে হলো মুনাফা কামাতে গিয়ে মূলধন বা পুঁজি হারানো। শয়তান যখন বান্দাকে সরাসরি গুনাহে লিপ্ত করতে পারে না, তখন সে বান্দাকে ‘নফল ইবাদতের’ আধিক্যে ব্যস্ত রেখে ‘ফরজ’ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত ইবাদত করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজও জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারা রাত জেগে ইবাদত করল।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৫৬)
আরও পড়ুন: ফরজ, সুন্নত ও নফল নামাজের পার্থক্য
শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজের কোনো বিকল্প নেই। নফল ইবাদত যতই বেশি হোক, তা ফরজের পরিপূরক হতে পারে না। এ বিষয়ে দালিলিক কিছু সতর্কবার্তা নিচে দেওয়া হলো-
১. আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় আমল: সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- ‘আমার বান্দা যে সমস্ত ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য হাসিল করে থাকে, তার মধ্যে ওই ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোনো ইবাদত নেই যা আমি তার উপর ফরজ করেছি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৫০২) অর্থাৎ, একটি ফরজ নামাজ হাজার রাকাত নফল নামাজের চেয়েও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।
২. নফল কবুলের পূর্বশর্ত: বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু বকর (রা.) তাঁর ওফাতের আগে হজরত ওমর (রা.)-কে অসিয়ত করেছিলেন- ‘জেনে রেখো, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো নফল ইবাদত কবুল হয় না, যতক্ষণ না ফরজ আদায় করা হয়।’ (কিতাবুল খারাজ, পৃ: ২৫; হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৩৬; কানজুল উম্মাল: ১৪১২৫)
অবশ্য আলেমদের একটি বড় অংশ মনে করেন, নফল ইবাদত একেবারে বিফলে যায় না। সুনানে তিরমিজির একটি ‘হাসান’ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন বান্দার ফরজের আমল অপূর্ণ থাকলে মহান আল্লাহ তাঁর নফল ইবাদত দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করার নির্দেশ দেবেন (সুনানে তিরমিজি: ৪১৩)। তবে এটি মূলত ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃত কোনো ঘাটতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ ত্যাগ করা একটি ‘কবিরা গুনাহ’, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সুতরাং নফলের মাধ্যমে ফরজের ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকলেও, জেনেশুনে ফরজের অবহেলা করে নফলের পেছনে ছোটা শরিয়তের দৃষ্টিতে বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
শয়তান যখন একজন মুমিন বান্দাকে সরাসরি গুনাহে লিপ্ত করতে পারে না, তখন সে ‘ভালো কাজের মাধ্যমে মন্দের দিকে’ ঠেলে দেওয়ার কৌশল নেয়। এটি ইবাদতকারীদের জন্য শয়তানের একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ। শয়তান বান্দাকে সারারাত নফল ইবাদতে এমনভাবে মশগুল রাখে, যাতে সে শেষরাতে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ফজরের ঠিক আগ মুহূর্তে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। এভাবে শয়তান একজন মুমিনের আমলনামা থেকে ফরজের মতো বিশাল পাওনা মুছে দিয়ে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আলেমদের মতে, ফরজের গুরুত্ব কমিয়ে নফলকে বড় করে দেখানোই শয়তানের এ রাতের প্রধান চাল।
আরও পড়ুন: নামাজ কবুল হওয়ার উপায়: সহজ ৬ শর্ত মানুন
এই বরকতময় রাতে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা বিশেষ সুরা পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। নির্ভরযোগ্য বর্ণনার ভিত্তিতে আমরা নিম্মোক্ত আমলগুলো করতে পারি-
ফরজ নামাজ নিশ্চিত করা: মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ অবশ্যই জামাতের সাথে আদায় করা।
বিশুদ্ধ তওবা: কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
নফল নামাজ: নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একাকী নফল নামাজ পড়া।
জিকির ও ইস্তেগফার: কোরআন তেলাওয়াত ও দরুদ শরিফ পাঠ করা। বিশেষ করে ‘সায়্যিদুল ইস্তেগফার’ পাঠ করা (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)।
দোয়া: বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে নিজের ও উম্মাহর জন্য কল্যাণ চাওয়া।
দান-সদকা: দান-সদকার মাধ্যমে নিজের ও মৃত আত্মীয়দের জন্য সওয়াব ও মাগফিরাত কামনা করা।
১৫ই শাবানের রোজা: আইয়ামে বিজের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে এই রোজা রাখা সওয়াবের কাজ।
ব্যক্তিগত ইবাদত: নফল ইবাদত মসজিদে ভিড় না করে নিজ ঘরে একাকী করাই উত্তম (ইকতিজাউস সিরাতিল মুস্তাকিম: ২/৬৩১)
আরও পড়ুন: রমজানের প্রস্তুতি: শাবান মাসে যে ৫ আমল মিস করা অনুচিত
শবে বরাতের ব্যাপক ক্ষমার সুযোগ সত্ত্বেও কিছু মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকেন, যতক্ষণ না তারা তাওবা করেন। হাদিসের আলোকে তারা হলেন- মুশরিক, হিংসুক ও বিদ্বেষ পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং মদ্যপায়ী ও অন্যায়ভাবে হত্যাকারী। এছাড়াও কোনো কোনো বর্ণনায় অহংকারবশত টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারীর বিষয়েও সতর্কবাণী এসেছে।
শয়তান মানুষকে ইবাদত থেকে সরাতে কিছু প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে, যেমন আতশবাজি, পটকা ফাটানো ও অতিরিক্ত আলোকসজ্জা। এগুলো একদিকে অপচয়, অন্যদিকে বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)। এছাড়া হালুয়া-রুটির আয়োজনে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়া এই রাতের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ ইবাদত ও তওবা থেকে মানুষকে বিচ্যুত করে।
শবে বরাত নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা সারা রাত জেগে ফজর মিস করার সংস্কৃতি নয়। বরং এটি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণের রাত। সারা রাত নফল ইবাদতের সওয়াব যেন একটি ফরজ নামাজ তরক করার গুনাহে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। শয়তানের সূক্ষ্ম কৌশল এড়িয়ে ফরজ নামাজকে প্রাধান্য দিয়ে বিশুদ্ধ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত অন্বেষণ করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।