ধর্ম ডেস্ক
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত ‘এপস্টেইন ফাইল’ ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী অপরাধীদের বিচারহীনতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি সামনে এনেছে। অর্থ, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং সামাজিক মর্যাদা ব্যবহার করে কীভাবে দশকের পর দশক ধরে ভয়াবহ অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া যায়, তা দেখে বিশ্ববাসী স্তম্ভিত। এই বাস্তবতা আধুনিক বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও নৈতিক ভিতকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইসলামের ইনসাফ বা ন্যায়বিচার ব্যবস্থার গুরুত্ব নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যা চৌদ্দশ বছর আগেই ঘোষণা করেছিল- অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সমাজে ক্ষমতাবানদের জন্য শিথিল আইন আর সাধারণের জন্য কঠোর দণ্ডবিধি কার্যকর হয়েছে, তখনই সেই সভ্যতার পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। ইসলাম এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে একটি জাতির ধ্বংসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ প্রসঙ্গে নবী কারিম (স.)-এর একটি সতর্কবার্তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। মক্কা বিজয়ের পর কোরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত নারীর চুরির অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার সুপারিশ করা হলে মহানবী (স.) অত্যন্ত রাগান্বিত হন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে একারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আর যখন কোনো সাধারণ মানুষ অপরাধ করত, তখন তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করা হতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কাটার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এই সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রমাণ করে যে, ন্যায়ের প্রশ্নে ইসলাম কোনো সামাজিক বা পারিবারিক আভিজাত্যের পরোয়া করে না।
আরও পড়ুন: কেমন ন্যায়বিচারের কথা বলে ইসলাম
ইসলামের ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি বা তাকওয়া। এই নীতিকে কেবল নৈতিক উপদেশে সীমাবদ্ধ রাখেনি ইসলাম; বরং একে কোরআনি নির্দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা ন্যায়ের ওপর অটল থাকে, এমনকি সেই সত্য যদি নিজের বা নিকটাত্মীয়ের বিপক্ষেও যায়। সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধেও হয়। সে বিত্তবান হোক বা দরিদ্র হোক, আল্লাহ উভয়েরই শ্রেষ্ঠতর হিতাকাঙ্ক্ষী।’
অর্থাৎ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিগত আবেগ, আত্মীয়তা বা জাগতিক লাভ-ক্ষতির হিসেব করার অবকাশ ইসলামে নেই। বিচার হতে হবে নিরঙ্কুশ ও নিরপেক্ষ।
খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে ন্যায়বিচারের যে চর্চা দেখা যায়, তা আধুনিক বিশ্বের বিচারহীনতার সংস্কৃতির মুখে এক চপেটাঘাত। খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ছেলে এক সাধারণ মিসরিয়র সাথে দুর্ব্যবহার করলে খলিফা গভর্নর ও তার ছেলেকে মদিনায় তলব করেন এবং সবার সামনে সেই সাধারণ মানুষকে দিয়ে বদলা নেওয়ার নির্দেশ দেন। গভর্নরের দিকে তাকিয়ে তিনি সেদিন ঐতিহাসিক এক উক্তি করেছিলেন- ‘তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাস বানিয়েছ, অথচ তাদের মায়েরা তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে?’
আরও পড়ুন: হজরত ওমর (রা.)-এর ন্যায়বিচার: একটি অমর দৃষ্টান্ত
একইভাবে হজরত আলী (রা.) খলিফা থাকাকালীন এক সাধারণ ইহুদির বিরুদ্ধে আদালতে বর্ম চুরির মামলা লড়েন এবং পর্যাপ্ত সাক্ষী না থাকায় বিচারক খলিফার বিপক্ষে রায় দেন। রাষ্ট্রের প্রধান হয়েও তিনি সেই রায় মাথা পেতে নেন। এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট করে যে, ইসলামে ক্ষমতা বা পদবী বিচারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে না।
আরও পড়ুন: হজরত আলীর বর্ম ও এক খ্রিস্টানের ইসলামগ্রহণের গল্প
এপস্টেইন ফাইলের মতো জঘন্য অপরাধচক্রের উন্মোচন জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করা স্বাভাবিক। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে যেকোনো দণ্ডবিধি কার্যকর করার একচ্ছত্র অধিকার কেবল বৈধ রাষ্ট্র ও বিচারবিভাগের। তাই আগে দরকার বৈধ রাষ্ট্র ও বিচারবিভাগ প্রতিষ্ঠা। এটি অত্যন্ত জরুরি। উম্মাহকে এ বিষয়ে অবশ্যই আগাতে হবে। ইসলাম মনে করে, আবেগতাড়িত ব্যক্তিগত আক্রোশ সমাজকে ‘ফিতনা’ বা চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়, যা পবিত্র কোরআনের ভাষায় ‘হত্যার চেয়েও ভয়াবহ’ (সুরা বাকারা: ১৯১)। তাই প্রভাবশালী অপরাধীদের দমনে রাষ্ট্রকে এমন এক ইস্পাতকঠিন আইনি কাঠামো ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ক্ষমতার দাপট বিচারকের কলমকে স্পর্শ করতে পারবে না। মূলত ইসলাম এমন এক স্বাধীন ও নৈতিক বিচারব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে, যেখানে বিচারক কেবল মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার চেতনা নিয়ে যাবতীয় ভয় বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করবেন।
এপস্টেইন ফাইল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল শক্তিশালী আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং সেই আইন প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন চারিত্রিক সততা ও জবাবদিহিতা। বিচারহীনতা সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়, মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং অপরাধীদের উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী- ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে’ (সহিহ বুখারি), এটিই হতে পারে আধুনিক সমাজ সংস্কারের মূলমন্ত্র।
ইসলামি ন্যায়বিচারের এই আদর্শ যদি আজ বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতো, তবে কোনো এপস্টেইন কিংবা কোনো প্রভাবশালী চক্রই বিচারের আওতার বাইরে থাকার সাহস পেত না। ইনসাফভিত্তিক সমাজই কেবল পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে পারে।