images

ইসলাম

অনর্থক তর্কে ধ্বংস, সংযমে জান্নাত

ধর্ম ডেস্ক

২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে ভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে এই মতভেদ যখন শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে জেদ ও অহংবোধের তর্কে রূপ নেয়, তখন তা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায়। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য সমভাবে মারাত্মক ক্ষতিকর। ইসলাম অনর্থক তর্ককে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। অযথা বিতর্ক কেবল ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে না, এটি অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি করে একটি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

অহেতুক বাদানুবাদ: ধ্বংসের মূল কারণ

অহেতুক তর্কে লিপ্ত হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এটি সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের অন্যতম প্রধান কারণ। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা বাদানুবাদ করো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাদানুবাদ করেই ধ্বংস হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি: ২৪১০) অর্থাৎ তর্কের মাধ্যমে জয়ী হওয়ার চেয়ে হৃদয়ের ঐক্য বজায় রাখা ইসলামের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় ব্যক্তি

যারা কেবল নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য বা অন্যকে হেয় করতে তর্কে লিপ্ত হয়, মহান আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। কোরআন মজিদে সুরা জুখরুফের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা কেবল বাগিবতণ্ডার উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে, বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়।’ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপছন্দনীয় হলো সেই ব্যক্তি, যে অতিমাত্রায় ঝগড়াটে ও বাগিবতণ্ডাকারী।’ (সহিহ বুখারি: ২৪৫৭)

বিতর্ক এড়িয়ে চলায় জান্নাতের গ্যারান্টি

তর্ক পরিহার করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বিশেষ করে যখন কেউ নিজে সত্যের ওপর থাকে, তখন চুপ থাকা আরও কঠিন। কিন্তু এই কঠিন সংযমের জন্য ইসলামে রয়েছে বিশাল পুরস্কার। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০) এটি প্রমাণ করে যে, তর্কে জয়ী হওয়ার চেয়ে শান্তি বজায় রাখা জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

পন্থা হতে হবে ‘সদুপদেশ ও সদ্ভাব’

ইসলাম সত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রয়োজনীয় আলোচনা বা সংলাপকে নিষেধ করেনি। তবে তার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা বেঁধে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দিন হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল: ১২৫) আহলে কিতাবদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও আল্লাহ ‘উত্তম পন্থা’ অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। (সুরা আনকাবুত: ৪৬)। ক্রোধের বদলে সহনশীলতা এবং হট্টগোলের বদলে যুক্তিপূর্ণ গাম্ভীর্যই হলো ইসলামী সংলাপের বৈশিষ্ট্য।

অজ্ঞদের সাথে মুমিনের আচরণ

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্যতম গুণ হলো তারা মূর্খদের সাথে তর্কে জড়ায় না। পবিত্র কোরআনে এদের ‘পরম দয়াময়ের বান্দা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ‘আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম।’ (সুরা ফুরকান: ৬৩) তারা অসার বাক্য শোনার পর সময় নষ্ট করে না। তারা বলে দেয়, ‘তোমাদের আমল তোমাদের জন্য এবং আমাদের আমল আমাদের জন্য; তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গে জড়াতে চাই না।’ (সুরা কাসাস: ৫৫)

সাফল্যের পথ

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কের সয়লাব দেখা যায়। মুমিন হিসেবে আমাদের উচিত পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ধ্বংসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। তর্কের মাধ্যমে অন্যকে পরাজিত করার চেয়ে ধৈর্য ও নম্রতার মাধ্যমে নিজের চরিত্রকে সুন্দর করা অধিক শ্রেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি বজায় রাখতে আমাদের সহনশীল হতে হবে। তর্কে জিততে গিয়ে হৃদয় হারানোর চেয়ে নীরব থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য।