ধর্ম ডেস্ক
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
মানুষের স্বভাব হলো- যখন সে সুখে থাকে, তখন সে রবকে ভুলে যায়। আর যখন বিপদ বা মসিবত আসে, তখন রবের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার কাছে সেই বান্দা অধিক প্রিয়, যে সচ্ছলতা ও সুখের সময়ও তাঁকে সমানভাবে স্মরণ করে। রাসুলুল্লাহ (স.) আমাদের শিখিয়েছেন, যারা সুখের দিনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর রাখে, বিপদের দিনে আল্লাহ তাদের ডাকে দ্রুত সাড়া দেন।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) এক অনন্য মূলনীতি ঘোষণা করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْتَجِيبَ اللَّهُ لَهُ عِنْدَ الشَّدَائِدِ وَالْكُرَبِ فَلْيُكْثِرِ الدُّعَاءَ فِي الرَّخَاءِ অর্থ: ‘যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, সংকট ও বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, সে যেন সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বেশি বেশি দোয়া করে।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮২; মুস্তাদরাকে হাকেম: ১৮০২; হাদিসটি হাসান)
সুখের সময় দোয়া করা হলো- আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা। কারণ, অভাব না থাকলে মানুষ সাধারণত চায় না। কিন্তু অভাব না থাকা সত্ত্বেও যে বান্দা আল্লাহর কাছে হাত পাতে, সে প্রমাণ করে যে, সে তার ‘সম্পদ বা সুস্থতার’ পূজা করে না, বরং সে একমাত্র ‘আল্লাহর’ ইবাদত করে। এই ইখলাস বা একনিষ্ঠতাই বিপদের সময় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: যে আমলে আল্লাহর সাহায্য অবধারিত
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন- تَعَرَّفْ إِلَى اللَّهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ অর্থ: ‘তুমি স্বচ্ছলতার সময়ে আল্লাহকে চিনে রাখো (স্মরণ করো), তিনি বিপদের সময়ে তোমাকে চিনবেন (সাহায্য করবেন)।’ (মুসনাদে আহমদ: ২৮০৩ (তাখরিজ শুয়াইব আরনাউত); মুস্তাদরাকে হাকেম: ৬৩০৩)
কোরআন মাজিদে সুখের দিনের আমল কীভাবে বিপদের দিনে কাজে আসে, তার দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
১. ইউনুস (আ.)-এর ঘটনা (ইতিবাচক উদাহরণ)
মাছের পেটে ঘোর বিপদে পড়ার পর ইউনুস (আ.) দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু কেন? আল্লাহ নিজেই এর কারণ জানিয়ে বলেন- ‘সে যদি (আগে থেকেই) আল্লাহর তাসবিহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতো, তবে সে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থেকে যেত।’ (সুরা সাফফাত: ১৪৩-১৪৪)
অর্থাৎ, সুখের দিনের ইবাদত ও জিকির বিপদের দিনে তাঁর মুক্তির কারণ হয়েছিল।
আরও পড়ুন: সবসময় এই ৫ দোয়া করুন, একটি কবুল হলেও জীবনে আর কিছু লাগবে না
২. ফেরাউনের ঘটনা (নেতিবাচক উদাহরণ)
ফেরাউন সারাজীবন সুখ ও ক্ষমতায় মত্ত থেকে আল্লাহকে ভুলে ছিল। যখন লোহিত সাগরে ডুবে মরার উপক্রম হলো, তখন সে ঈমান আনার ও দোয়া করার চেষ্টা করল। কিন্তু আল্লাহ তার সেই বিপদের দোয়া প্রত্যাখ্যান করলেন। আল্লাহ বলেন- ‘এখন (ঈমান আনছ)? অথচ এর আগে তো তুমি অবাধ্যতা করেছ এবং তুমি ছিলে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউনুস: ৯১)
সুখের দিনে দোয়া বলতে শুধু চাওয়া নয়, বরং নিচের আমলগুলো করা বোঝায়-
১. শোকরগুজার হওয়া: সুস্থতা ও সম্পদ থাকলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা এবং এই নেয়ামত যেন কেড়ে নেওয়া না হয়, সেই দোয়া করা।
২. ইস্তেগফার করা: বিপদ আসার আগেই পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া।
৩. অন্যের জন্য দোয়া করা: নিজের সমস্যা নেই, তাই বিপদগ্রস্ত ভাইদের জন্য দোয়া করা।
আমরা যেন শুধু মৌসুমি ইবাদতকারী না হই। বরং সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখি। যে বান্দা স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ তাকে সংকটের সময় একা ছেড়ে দেন না। এটাই আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ আমাদের সুখের দিনে বেশি বেশি শোকর ও দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।