images

ইসলাম

সন্তান জন্মের পর করণীয় সুন্নতসমূহ

ধর্ম ডেস্ক

০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত মুমিনের প্রতিটি কাজই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে হওয়া বাঞ্ছনীয়। আল্লাহর রাসুল (স.)-এর জীবনীতেই রয়েছে জীবন পরিচালনার সর্বোত্তম আদর্শ। তাই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কাজ শরিয়ত মোতাবেক পরিচালিত হওয়া ঈমানের একান্ত দাবি।
সন্তান জন্ম নেওয়া পরিবারের জন্য আনন্দের বিষয়। এই আনন্দঘন মুহূর্তে নবজাতকের প্রাথমিক কাজগুলো সুন্নতের আলোকে পালন করা অভিভাবকের দায়িত্ব। রাসুল (স.) হাদিস শরিফে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর অভিভাবকদের করণীয়গুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। নিচে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

১. আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন

সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা করা, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা এবং সন্তানের জন্য কল্যাণের দোয়া করা উচিত। হজরত ইবরাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভ করার পর এমনটি করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে সেই দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে- ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয়ই আমার রব দোয়া শ্রবণকারী। হে আমার রব! আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন। হে আল্লাহ! যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার পিতামাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দেবেন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৩৯-৪১)

২. আজান ও ইকামত দেওয়া

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল হলো নবজাতকের ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া। এটি শয়তানের প্রভাব থেকে শিশুকে রক্ষা করে এবং তাওহিদের বাণী তার কানে পৌঁছে দেয়। হজরত আবু রাফে (রা.) বলেন, ‘ফাতেমার ঘরে হাসান ইবনে আলি ভূমিষ্ঠ হলে, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে তার কানে আজান দিতে দেখেছি।’ (আবু দাউদ: ৫১০৫; তিরমিজি: ১৫১৪)

আরও পড়ুন: জন্মের পর শিশুকে মধু খাওয়ানো কি সুন্নত?

৩. তাহনিক করা (মিষ্টিমুখ করানো)

তাহনিক অর্থ হলো, কোনো বুজুর্গ বা নেককার ব্যক্তির মাধ্যমে খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু চিবিয়ে বাচ্চার মুখে দেওয়া। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে খেজুর দিয়ে তাহনিক করা সুন্নত। হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, ‘আমার এক সন্তান জন্ম নিলে আমি তাকে রাসুল (স.)-এর কাছে নিয়ে যাই। তিনি তার নাম রাখেন ইবরাহিম। অতঃপর খেজুর দিয়ে তাহনিক করেন, তার জন্য বরকতের দোয়া করেন এবং আমার কাছে ফিরিয়ে দেন।’ (বুখারি: ৫৪৬৭)

৪. সুন্দর নাম রাখা

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম দিন বা সপ্তম দিন নবজাতকের অর্থবোধক সুন্দর নাম রাখা সুন্নত। রাসুল (স.) বলেন, ‘আজ রাতে আমার একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে, আমার পিতা ইবরাহিমের নামানুসারে আমি তার নামকরণ করেছি ইবরাহিম।’ (মুসলিম: ২৩১৫) অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (স.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নিজ নামে ও তোমাদের বাপ-দাদার নামে আহ্বান করা হবে, অতএব তোমরা তোমাদের (সন্তানদের) নাম সুন্দর করে নাও।’ (আবু দাউদ: ৪৯৪৮)

৫. আকিকা করা

নবজাতকের বয়স সাত দিন হলে আকিকা দেওয়া সুন্নত। হজরত সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘প্রত্যেক সন্তান তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক হিসেবে রক্ষিত। অতএব সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে আকিকা করো, তার চুল কাটো ও তার নাম রাখো।’ (মুসনাদে আহমদ: ২০০৮৩; তিরমিজি: ১৫২২)

বি.দ্র. সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। কোনো কারণে সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে ১৪তম বা ২১তম দিনে করা যাবে। তাও সম্ভব না হলে জীবনের যেকোনো সময় আদায় করে নেওয়া যাবে।

আরও পড়ুন: আকিকা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা 

৬. মাথা মুণ্ডন ও সদকা করা

নবজাতকের জন্মের সপ্তম দিন মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজন পরিমাণ রূপা বা তার সমপরিমাণ অর্থ দান করা সুন্নত। আলী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) হাসানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল দ্বারা আকিকা করেছিলেন আর বলেছিলেন, হে ফাতিমা! হাসানের মাথা মুণ্ডিয়ে দাও আর তার চুলের সমপরিমাণ ওজনে রুপা সদকা করে দাও। (সুনানে তিরমিজি: ১৫১৯)
মাথা মুণ্ডনের পর বাচ্চার মাথায় জাফরান লাগানোও একটি সুন্নত আমল।

৭. খৎনা করা

ছেলে সন্তানের খৎনা করা সুন্নত এবং ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং অন্য কোনো কোনো মাজহাবে এটি ওয়াজিব। হজরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) সপ্তম দিন হাসান এবং হুসাইনের আকিকা দিয়েছেন ও খৎনা করিয়েছেন।’ (তাবারানি, আল-আওসাত: ৬৭০৮) নবজাতকের জন্মের ৭ দিন থেকে শুরু করে সাবালক হওয়ার আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় খৎনা করানো যায়। তবে ৭ম দিনে বা ৭ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই খৎনা করিয়ে নেওয়া উত্তম।

মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত হাদিসের আলোকে নবজাতকের এই হকগুলো যথাযথভাবে পালন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক পরিবার ও সমাজ গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।