images

ইসলাম

কোরবানির পশু কেনার আগে যা দেখবেন, শরিয়তের বিধান ও পরামর্শ

ধর্ম ডেস্ক

০৭ জুলাই ২০২২, ০১:৪৪ পিএম

কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মহান ইবাদত। এই ইবাদত কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো পশু নিখুঁত ও দোষমুক্ত হওয়া। হাটে গিয়ে আমরা অনেক সময় কেবল মোটাতাজা পশু দেখে আকৃষ্ট হই, কিন্তু শরিয়ত নির্ধারিত ত্রুটিগুলো খেয়াল করি না। পশু কেনার আগে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই যাচাই করুন।

এক. বয়স যাচাই: শরিয়তের প্রথম শর্ত

পশুর নির্ধারিত বয়স পূর্ণ না হলে কোরবানি জায়েজ হবে না, সে যতই হৃষ্টপুষ্ট হোক।
গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ হতে হবে। নিচের পাটির সামনে অন্তত দুটি স্থায়ী দাঁত দেখে বয়স নিশ্চিত করুন। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ছয় মাসের দুম্বা বা ভেড়া যদি দেখতে এক বছরের মতো স্বাস্থ্যবান হয়, তবে তা জায়েজ। উটের ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া আবশ্যক।
সূত্র: ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯৭; বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২১৫

দুই. যে চারটি ত্রুটি থাকলে কোরবানি হবে না

রাসুলুল্লাহ (স.) চারটি প্রধান ত্রুটির কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো থাকলে কোরবানি জায়েজ নয়।
প্রথমত, অন্ধ পশু- যে পশু চোখে দেখে না। এক চোখের দৃষ্টি এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি নষ্ট হলেও কোরবানি হবে না। দ্বিতীয়ত, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু- যেমন মুখ দিয়ে অনবরত লালা পড়া, জাবর না কাটা বা শরীরের পশম উঠে যাওয়া। তৃতীয়ত, পঙ্গু পশু- যে পশু এক পায়ে খুঁড়িয়ে চলে এবং সেই পা মাটিতে রাখতে পারে না, অথবা তিন পায়ে ভর দিয়েও জবাইর স্থান পর্যন্ত যেতে অক্ষম। চতুর্থত, অতিশয় জীর্ণ পশু- যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।
সূত্র: জামে তিরমিজি: ১৪৯৭; সুনানে আবু দাউদ: ২৮০২; সহিহ মুসলিম: ১৯৬৩

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু নিয়ে সেলফি-ছবি শেয়ার, ইসলাম কী বলে 

তিন. কান, লেজ ও শিং পরীক্ষা

হাদিসে পশুর চোখ ও কান ভালো করে পরীক্ষা করার নির্দেশ এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ: ২৮০৪)
কান বা লেজের অর্ধেকের বেশি কাটা থাকলে কোরবানি জায়েজ হবে না। তবে জন্মগতভাবে কান ছোট হলে সমস্যা নেই। শিং যদি একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, তাহলে কোরবানি হবে না। তবে আংশিক বা অর্ধেক শিং ভাঙলে কোরবানিতে অসুবিধা নেই।
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ২৮০৪; রদ্দুল মুহতার: ৬/৩২৪

চার. গর্ভবতী গাভির মাসয়ালা

গর্ভবতী পশু কোরবানি করা মূলত জায়েজ। তবে বাচ্চা প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে এমন পশু কোরবানি করা মাকরুহ, কারণ এতে বাচ্চার কষ্ট হয়। পশু কেনার সময় ওলান ও পেটের আকার দেখে এবং অভিজ্ঞ কারো সহায়তায় গর্ভাবস্থার পরিপক্কতা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
জবাইয়ের পর পেটে জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে তা সদকা করা বা আলাদাভাবে জবাই করে গোশত খাওয়া উভয়ই বৈধ। তবে মৃত বাচ্চা পাওয়া গেলে তার গোশত খাওয়া হালাল নয়।
(হেদায়া: ৪/৪৩২; ফতোয়ায়ে শামি: ৫/২২৭)

পাঁচ. কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ চেনার উপায়

অসাধু ব্যবসায়ীরা ইনজেকশন বা স্টেরয়েড দিয়ে পশুকে দ্রুত ফোলায়। ‘মোটা মানেই সুস্থ নয়’-এই সতর্কতা সবসময় মাথায় রাখুন।
পরীক্ষার উপায়: পশুর রানের মাংসে আঙুল দিয়ে চাপ দিন। মাংস শক্ত থাকলে পশু সুস্থ। চাপ দিলে গর্ত হয়ে যায় এবং আগের অবস্থায় ফিরতে দেরি হলে বুঝবেন পশুকে ওষুধ দিয়ে ফোলানো হয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ খাওয়ানো পশু দ্রুত শ্বাস নেয় এবং অস্বাভাবিক ক্লান্ত ও ঝিমুনি ভাব দেখায়।

আরও পড়ুন: কোরবানির পশু যত বড় সওয়াব কি তত বেশি?

ছয়. সুস্থ পশু চেনার সাধারণ লক্ষণ

সুস্থ পশুর নাকের ওপরের অংশ (মাজল) সবসময় ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকবে; শুকনো থাকলে জ্বরের লক্ষণ। সুস্থ পশু কান ও লেজ নাড়িয়ে মশামাছি তাড়াবে এবং মানুষ কাছে গেলে সতর্ক হবে। উজ্জ্বল চোখ ও মসৃণ পশম সুস্থতার চিহ্ন। সুস্থ পশু স্বাভাবিকভাবে জাবর কাটবে; জাবর না কাটা অসুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ।

সাত. কেনার সময় আরও কিছু পরামর্শ

রাতে কৃত্রিম আলোতে পশুর প্রকৃত রঙ, চামড়ার রোগ (যেমন লাম্পি স্কিন) বা চোখের সমস্যা ধরা কঠিন। তাই সবসময় দিনের আলোতে পশু কিনুন। হাট থেকে পশু আনার পর অন্তত আট থেকে দশ ঘণ্টা বিশ্রাম দিন এবং প্রয়োজনে স্যালাইন পানি পান করান।
হাটের নির্ধারিত টোল বা হাসিল পরিশোধ করে বৈধ রসিদ সংগ্রহ করুন। এটি নাগরিক সততার অংশ এবং সামাজিক দায়িত্ব।

পশুর বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে ত্রুটিমুক্ততা ও নিয়তের বিশুদ্ধতাই কোরবানির মূল শর্ত। শরিয়তের বিধান মেনে সঠিক পশু বেছে নিন- এটিই প্রকৃত ইবাদতের পথ।

তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ১৯৬৩; জামে তিরমিজি: ১৪৯৭; সুনানে আবু দাউদ: ২৮০২, ২৮০৪; ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯৭; বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২১৫; রদ্দুল মুহতার: ৬/৩২৪; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ