ধর্ম ডেস্ক
০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৫ পিএম
ইসলামি শরিয়তে বিয়ের বিধান কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। এতে নির্দিষ্ট পর্যায়ে কিছু বিয়ে নিষিদ্ধ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দূরবর্তী বা জটিল বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বেয়াই (পুত্রবধুর বাবা বা মেয়ের স্বামীর বাবা) ও বেয়াইন (পুত্রবধুর মা বা মেয়ের স্বামীর মা)-এর মধ্যে পারস্পরিক বিয়ের বিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয়।
এই প্রতিবেদনে কোরআন, হাদিস ও ফিকহি গ্রন্থের আলোকে এ সংক্রান্ত বিধান বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ইসলামি ফিকহের সকল মাজহাব অনুযায়ী বেয়াই-বেয়াইনের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে শরয়ীভাবে জায়েজ ও বৈধ। এর পক্ষে মূল দলিল হলো- সুরা নিসা (২৩–২৪ নং আয়াত) বিয়ে নিষিদ্ধ নারীদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রদান করা হয়েছে- ‘তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাতিজি, ভাগ্নি, দুধমা, দুধবোন...’ এই তালিকায় বেয়াই বা বেয়াইন সম্পর্কের উল্লেখ নেই। ইসলামি উসুল অনুযায়ী, যা স্পষ্টভাবে হারাম করা হয়নি তা হালাল বা জায়েজ।
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়্যা গ্রন্থে উল্লেখ আছে- ‘কারো জন্য তার পুত্রবধুর মা (বেয়াইন) অথবা তার কন্যার শ্বশুর (বেয়াই)-এর সঙ্গে বিবাহ করাতে কোনো সমস্যা নেই।’ (১/২৭৭)
মুহিতুস-সারখসিসহ অন্যান্য হানাফি ফিকহ গ্রন্থেও এ ধরনের বিবাহের বৈধতা স্বীকৃত।
আরও পড়ুন: বিয়ের কত দিনের মধ্যে মোহরানা পরিশোধ করা উত্তম
যদি দুই পরিবারের সন্তান পরস্পরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তাহলে পরস্পরের পিতামাতা (বেয়াই-বেয়াইন) বিবাহ নিষিদ্ধ হবে না। অর্থাৎ, সন্তানদের বিবাহের কারণে পিতামাতার মধ্যে মাহরামিয়্যাত সৃষ্টি হয় না।
A-এর ছেলে মহিউদ্দিন B-এর মেয়ে আয়েশাকে বিয়ে করেছে। তাই A হচ্ছেন আয়েশার শ্বশুর, আর B মহিউদ্দিনের শাশুড়ি।
এক্ষেত্রে A ও B বেয়াই-বেয়াইনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে সরাসরি বিয়ে নিষিদ্ধ নয়।
আরও পড়ুন: যেসব নারীকে বিয়ে করা ইসলামে নিষেধ
যদিও শরয়ী দৃষ্টিতে এ বিবাহ বৈধ, তবুও কিছু বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন।
১. পরিবারিক সম্প্রীতি ও পূর্ব-আলোচনা
সম্মতি: সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের (সন্তান, পূর্ব স্বামী/স্ত্রীর আত্মীয় ও অন্যান্য আত্মীয়) স্বচ্ছ সম্মতি নেওয়া উচিত।
আলোচনা: বিয়ের পর সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।
পরামর্শ: অভিজ্ঞ আলেম বা পারিবারিক প্রধানের পরামর্শ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।
২. উত্তরাধিকার ব্যবস্থা
নতুন দম্পতি: বিবাহিত দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক শরয়ী উত্তরাধিকার কার্যকর হবে।
পূর্বসন্তান: পূর্বের সন্তানদের অধিকার ও সম্পদ বণ্টন ওসিয়ত (ইচ্ছাপত্র) বা শরয়ী বিভাজনের মাধ্যমে স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি।
আর্থিক সুরক্ষা: বিশেষ করে নারীদের জন্য দেনমোহর ও অন্যান্য আর্থিক অধিকার পরিষ্কারভাবে নথিবদ্ধ করা উচিত।
৩. সামাজিক সংবেদনশীলতা
স্থানীয় রীতি: স্থানীয় সামাজিক রীতিনীতি, পারিবারিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।
ধীরস্থিরতা: পরিবার ও সম্প্রদায়ের সাথে মতবিনিময় করে ধীরেসুস্থে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত।
শিষ্টাচার: নতুন সম্পর্কের ভিত্তিতে সামাজিক শিষ্টাচার ও সম্বোধন পদ্ধতি আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত।
ইসলামি শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান, কোরআনি নির্দেশনা, নববি সুন্নাহ ও ফিকহি ঐকমত্য অনুযায়ী বেয়াই-বেয়াইনের পরস্পর বিবাহ সম্পূর্ণ জায়েজ ও শরয়ীভাবে বৈধ। কোরআন-সুন্নাহতে এ সম্পর্কে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায়, মুসলিম সমাজের উচিত এ বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং ভিত্তিহীন কুসংস্কার, সামাজিক প্রথা বা অজ্ঞতাজনিত চাপে শরয়ী বৈধতাকে অস্বীকার না করা।
যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, তাই এটি শুধু বৈধতা-অবৈধতার সীমানাই নির্দেশ করে না, বরং প্রজ্ঞা, ভারসাম্য ও সামাজিক দায়িত্বশীলতারও শিক্ষা দেয়। তাই এ ধরনের বিবাহে উদ্যোগী হলে শরয়ী বৈধতার পাশাপাশি পারিবারিক সম্প্রীতি, সামাজিক সংহতি ও সকল পক্ষের কল্যাণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি, সকল বৈধ বিবাহই ইসলামের দৃষ্টিতে সম্মানজনক ও পবিত্র বন্ধন, যদি তা আল্লাহর বিধান মেনে, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্ববোধ, প্রজ্ঞা ও সুপরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।