images

ইসলাম

লজ্জা না থাকলে যা ইচ্ছে তাই করো: হাদিসে মানবচরিত্রের যুগান্তকারী পাঠ

ধর্ম ডেস্ক

৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২৫ পিএম

ইসলাম লজ্জাশীলতাকে (হায়া) মানব চরিত্রের একটি অপরিহার্য গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড। আবূ মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী নবীদের নসিহত থেকে মানুষ যা লাভ করেছে তার একটি হলো- যদি তুমি লজ্জাই না করো, তাহলে যা ইচ্ছে তাই করো।’ (সহিহ বুখারি: ৬১২০)

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বাণী মানব চরিত্রের নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে লজ্জার গুরুত্ব নির্দেশ করে।

কোরআনে লজ্জার প্রশংসা

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক; তা সর্বোত্তম।’ (সুরা আরাফ: ২৬)

তাফসিরবিদ আলুসি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে ‘তাকওয়ার পোশাক’ বলতে লজ্জাশীলতাকেই বোঝানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: যেসব কাজে মুমিনের লজ্জাবোধ

এছাড়াও কোরআনে মাদয়ান শহরের ঘটনা উল্লেখ করে শুয়াইব (আ.)-এর কন্যার লজ্জাশীল আচরণের প্রশংসা করা হয়েছে- ‘তখন নারীদ্বয়ের একজন লজ্জাজড়িত চরণে তার কাছে এলো এবং বলল...’ (সুরা কাসাস: ২৫) ওমর (রা.) এ বাক্যাংশটির এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন- ‘সে নিজের মুখ ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে লজ্জাজড়িত পায়ে হেঁটে এলো।’ (বাগভি; কুরতুবি; ইবন কাসির; ফাতহুল কাদির)

নবীজির লজ্জাশীলতার অনন্য উদাহরণ

নবীজি (স.) নিজেও অত্যন্ত লাজুক ছিলেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘পর্দার অন্তরালের কুমারীদের চেয়েও নবীজি (স.) অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। যখন তিনি তাঁর কাছে অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন, তখন আমরা তাঁর চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম।’ (সহিহ বুখারি : ৬১০২)

এটি প্রমাণ করে, লজ্জাশীলতা ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য ও নৈতিক সতর্কতার অংশ।

আরও পড়ুন: 'ভুল স্বীকার' মুমিনের মহান গুণ ও আত্মিক উন্নতির চাবিকাঠি

লজ্জা ঈমানের অঙ্গ

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘লজ্জা হলো ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৮) আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘লজ্জা-সন্ত্রম হচ্ছে ঈমানের অঙ্গ, আর ঈমানের (ঈমানদারের) জায়গা জান্নাতে। নির্লজ্জতা ও অসভ্যতা হচ্ছে দুর্ব্যবহারের অঙ্গ, আর দুর্ব্যবহারের (দুর্ব্যবহারকারীর) জায়গা জাহান্নামে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২০০৯)

ইবনে মাজাহ (হাদিস: ৪১৮১) উল্লেখ করেছেন, ‘প্রতিটি ধর্মেরই একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো ’লজ্জাশীলতা’।

লজ্জাশীলতার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব

লজ্জাশীলতা মানুষের কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে, পাপ থেকে রক্ষা করে এবং ন্যায়ের পথে চালিত করে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা শুধু কল্যাণ নিয়ে আসে; অন্যকিছু নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬১১৭)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা যেকোনো বস্তুর কদর্যতা বাড়ায়, আর লাজুকতা তার শ্রীবৃদ্ধি করে।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৯৭৪)

আরও পড়ুন: সত্যের পথে ফিরে আসা মুমিনের অমূল্য গুণ

লজ্জাহীনতার বিপদ ও কেয়ামতের নিদর্শন

নির্লজ্জতা কেয়ামতের অন্যতম নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করেছেন, ‘কেয়ামতের নিদর্শনগুলোর একটি হলো, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা।’ (মুসনাদে বাজজার: ৭৫১৮) ‘শেষ যুগে জনসম্মুখে অনৈতিক কাজ সংঘটিত হবে, তখন যে ব্যক্তি বলবে- ‘দেয়ালের পেছনে সরে যাও’, সে হবে সেই যুগের সবচেয়ে ভদ্র মানুষ।’ (মুসনাদে আবি ইয়ালা: ৬১৮৩)

লজ্জাশীলতা ও প্রয়োজনের সামঞ্জস্য

লজ্জাশীলতা কখনো কল্যাণপূর্ণ প্রয়োজন পূরণে বাধা সৃষ্টি করে না। সাহাবায়ে কেরামও নির্দ্বিধায় পবিত্রতা সংক্রান্ত প্রশ্ন করতেন এবং নবীজি (স.) স্পষ্টভাবে উত্তর দিতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮০)

এটি প্রমাণ করে যে, লজ্জাশীলতা এবং প্রয়োজন পূরণ একসঙ্গে হতে পারে; যা নৈতিকতার সঙ্গে কোনো সংঘাত সৃষ্টি করে না।

আরও পড়ুন: যে ৬ গুণে ঈমান পূর্ণ হয় 

মোটকথা,  লজ্জাশীলতা নৈতিক সৌন্দর্য, এটি ঈমানের অঙ্গ, সমাজের মেরুদণ্ড এবং মানব চরিত্রের ভিত্তি। রাসুল (স.)-এর বাণী- ‘যদি তুমি লজ্জাই না করো, তাহলে যা ইচ্ছে তাই করো।’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, লজ্জাহীনতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে লজ্জাশীলতার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।