ধর্ম ডেস্ক
১১ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৩২ পিএম
মৃত্যু পরবর্তী জীবন ও কবরের আজাব ইসলামি বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কবরের শাস্তির নানা কারণ বর্ণিত হয়েছে। এসব কারণ জানা ও তা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (স.) অধিকাংশ কবর আজাবের একটি প্রধান কারণ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, যা আমাদের সকলের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, অধিকাংশ কবর আজাবের কারণ হলো প্রস্রাবের সংস্পর্শ থেকে সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন না করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘বেশির ভাগ কবরের আজাব প্রস্রাব থেকে অসতর্কতার কারণেই হয়ে থাকে।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৪৮)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘প্রস্রাবের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবরের আজাব হয়ে থাকে; অতএব তোমরা যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন করো।’ (তাবরানি: ১১১০৪)
পবিত্রতা অর্জন ইসলামে শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; বরং এটি ঈমান ও ইবাদতেরও মৌলিক শর্ত।
আরও পড়ুন: মৃতব্যক্তিকে কবরে সকাল-সন্ধ্যায় যা দেখানো হয়
ইসলামি সূত্র অনুযায়ী, কবর আজাবের আরও কিছু প্রধান কারণ হলো
১. পরনিন্দা ও অপবাদ: অন্যের দোষ চর্চা ও গিবত করা।
২. অন্যের দোষ খোঁজা: কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তার ত্রুটি অনুসন্ধান করা।
৩. অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ: জুলুম, ঠকানো বা ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন।
৪. ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা: ব্যবসা বা সামাজিক জীবনে প্রতারণা করা।
৫. কোরআন-হাদিস অস্বীকার: ইসলামি বিধান নিয়ে অবজ্ঞা বা অমর্যাদা করা।
৬. কোরআন থেকে বিমুখতা: কোরআন তেলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুধাবনে অনীহা।
৭. ফরজ নামাজ ত্যাগ: অলসতা বা অবহেলার কারণে নামাজ না পড়া।
৮. মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।
৯. সুদ লেনদেন: সুদের যেকোনো রূপে অংশগ্রহণ করা।
১০. জেনা-ব্যভিচার: অশ্লীলতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।
(সূত্র: ড. খালিদ রাতিব, ‘আল-আসবাব আল-মুনজিয়া মিন আজাবিল কবর’, শাবকাতুল আলুকাহ: ০৪-১১-২০১৮)
আরও পড়ুন: কবর প্রতিদিন মানুষকে যে কথাগুলো বলে
এই ভয়াবহ আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো-
গুনাহ বর্জন: কবর আজাবের কারণসমূহ থেকে বিরত থাকা এবং আন্তরিক তওবা করা।
মৃত্যুর স্মরণ: নিয়মিত মৃত্যুচিন্তা গুনাহ থেকে বিরত রাখে ও নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করে।
আকিদার শুদ্ধতা: তাওহিদ ও সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ বিশ্বাস পোষণ করা।
তাকওয়া অর্জন: আল্লাহভীতির সাথে জীবন পরিচালনা করা।
আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা রাখা।
নেক আমলে যত্নবান হওয়া: সৎ কাজের প্রতি মনোযোগ ও নিয়মিত আমলের হিসাব রাখা।
সুরা মুলক তেলাওয়াত: নিয়মিত এই সুরা পাঠ কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ আমল।
(সূত্র: ড. খালিদ রাতিব, পূর্বোক্ত গ্রন্থ)
আরও পড়ুন: কবর জিয়ারতের সময় ৫ বিষয় খেয়াল রাখবেন
রাসুলুল্লাহ (স.) নিয়মিত নিচের দোয়াটি পাঠ করতেন এবং সাহাবাদেরও তা শেখাতেন-
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন আজাবি জাহান্নামা, ওয়া আউজু বিকা মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আউজু বিকা মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জালি, ওয়া আউজু বিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত।
অর্থ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নামের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, মাসিহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই, এবং জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। (আবু দাউদ: ১৫৪২)
কবর আজাব একটি বাস্তব ও ভীতিকর বিষয়, তবে আল্লাহর রহমত ও আমাদের আমলই নির্ধারণ করে আমাদের পরিণতি। হাদিসে বর্ণিত কারণগুলো বিশেষত পবিত্রতা অর্জনে অবহেলা আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তাই প্রতিদিনের জীবনে পরিচ্ছন্নতা, গুনাহ থেকে বিরত থাকা, নেক আমল করা এবং রাসুলুল্লাহ (স.) শেখানো দোয়াগুলো পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।
এটাই আমাদের প্রকৃত সাফল্যের পথ; যার মাধ্যমে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতের আজাব থেকে নিরাপদ থেকে আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের যোগ্য হতে পারব।