ধর্ম ডেস্ক
২৬ আগস্ট ২০২৫, ০৩:২৪ পিএম
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন- আখেরাতের সেই ভয়াবহ দিনে ধন-সম্পদ কিংবা পার্থিব সম্পর্ক কোনো কাজে আসবে না; মুক্তি লাভ করবে কেবল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে একটি ‘কালবুন সালিম’ বা বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- يَوۡمَ لَا يَنۡفَعُ مَالٌ وَّ لَا بَنُوۡنَ اِلَّا مَنۡ اَتَی اللّٰهَ بِقَلۡبٍ سَلِیۡمٍ “যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; শুধুমাত্র সেদিন উপকৃত হবে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।” (সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯)
এই আয়াতগুলো কেয়ামতের দিনের এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য তুলে ধরে, যখন দুনিয়ার সব সম্পদ অর্থহীন হয়ে পড়বে। আসুন, কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই চূড়ান্ত বার্তার তাৎপর্য এবং বিশুদ্ধ অন্তর অর্জনের উপায়গুলো অনুধাবন করার চেষ্টা করি।
ইসলামে অন্তরের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মানবদেহে একটি অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে পুরো শরীর সুস্থ থাকে এবং যা অসুস্থ হলে পুরো শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর সেটি হলো অন্তর। এই অন্তরের পরিশুদ্ধতার ওপরই মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- “সে-ই সফল যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে সে ক্ষতিগ্রস্ত।” (সুরা শামস: ৮-৯)
কেয়ামতের দিন এই পরিশুদ্ধ অন্তর ছাড়া কিছুই উপকারে আসবে না। কোরআন কঠোর হৃদয়ের নিন্দা করে বলেছে- “দুর্ভোগ তাদের জন্য, যাদের অন্তর কঠোর, যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ। তারা স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট।” (সুরা জুমার: ২২)
আরও পড়ুন: অন্তরের যেসব ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি
কোরআনে মুক্তির একমাত্র শর্ত হিসেবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে হাজির হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মুফাসসিরগণ ‘কালবুন সালিম’কে এমন হৃদয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা শিরক, কুফর ও নিফাক থেকে মুক্ত। যার নিয়ত খাঁটি, যা অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ এবং অন্যান্য আধ্যাত্মিক রোগ থেকে পবিত্র এবং যা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পিত।
হাদিসে এর সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বলেন- “প্রত্যেক সত্যবাদী ও বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি।” (ইবনে মাজাহ: ৪২১৬)
জিজ্ঞেস করা হলো, বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী কে? তিনি বলেন- “সে হলো পূত-পবিত্র চরিত্রের মানুষ, যার অন্তরে নেই গুনাহ, নেই শত্রুতা, নেই হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ও কপটতা।” (ইবনে মাজাহ: ৪২১৬)
আলেমদের মতে, হৃদয় পরিশুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় ঈমান, সৎ আমল এবং আল্লাহর অবিরাম স্মরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন- “জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।” (সুরা আর-রাদ: ২৮)
রাসুলুল্লাহ (স.) আত্মশুদ্ধির জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সুস্থ অন্তর প্রার্থনা করছি।” (মুসনাদে আহমদ: ১৭১১৪)
আরও পড়ুন: ঝগড়া এড়িয়ে চলার প্রতিদান
সুরা শুআরার এই আয়াতগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার প্রতিপত্তি, ধন-সম্পদ কিংবা সন্তান-সন্ততি প্রকৃত সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। কেয়ামতের ময়দানে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড হবে বিশুদ্ধ অন্তর। “তাদের জন্য তাদের রবের কাছে পুরস্কার আছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” (সুরা বাকারা: ৬২)
অতএব, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ত্যাগ করে আমাদের উচিত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অটল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ‘কালবুন সালিম’ নিয়ে তাঁর দরবারে হাজির হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।