images

ইসলাম

শিশুদের প্রতি নবীজির (স.) ভালোবাসা

ধর্ম ডেস্ক

০৭ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৫৩ পিএম

প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই ফুটে উঠেছে কোমলতা, দয়া ও মানবিকতা। এই মহত্বের মাঝে একটি বিশেষ দিক হলো—শিশুদের প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা, স্নেহ ও সম্মান। শিশুদের জন্য তাঁর হৃদয় ছিল পরিপূর্ণ ভালোবাসায় ভরা, যা আজও সব বাবা-মা, শিক্ষক ও সমাজের মানুষের জন্য এক অনন্য আদর্শ।

স্নেহময় আচরণ ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা

রাসুল (স.) শিশুদের ভালোবাসতেন এবং তাদের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে মানুষকে শিক্ষা দিতেন। তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪৩)। তাঁর এই শিক্ষা ইসলামি সমাজকে শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল ও মানবিক করে তুলেছে।

ভালোবাসা প্রকাশের ভিন্ন আঙ্গিক

একবার নবীজি (স.) তাঁর নাতি হাসান (রা.)-কে চুমু খাচ্ছিলেন। পাশে থাকা আকরা ইবনে হাবিস (রা.) বললেন, ‘আমার ১০ জন সন্তান আছে, আমি কাউকে কখনো চুমু দেইনি।’ জবাবে নবীজি (স.) বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭)

আরেকবার তিনি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হুসাইন (রা.)-কে খেলা করতে দেখে হাসাতে হাসাতে কোলে তুলে নিলেন এবং বললেন, ‘হুসাইন আমার অংশ, আর আমি হুসাইনের অংশ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৪)

জাফর (রা.) শহীদ হলে নবীজি (স.) তাঁর সন্তানদের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে আদর করেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেন। (আল আদাবুল মুফরাদ: ৩৬৪)

আরও পড়ুন: নবীজির হাসিখুশির ঘটনা

শিশুদের সঙ্গে হাসি-তামাশা ও কৌতুক

নবীজি (স.) ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত। তিনি শিশুদের খুশি রাখতে তাদের সঙ্গে রসিকতা করতেন। একবার তিনি ছোট্ট আনাস (রা.)-কে আদর করে বলেন, ‘হে দুই কানওয়ালা!’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫০০২)।

আবু উমাইর নামে এক শিশুর পোষা পাখি মারা গেলে নবীজি (স.) তার দুঃখে ব্যথিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘আবু উমাইর, তোমার নুগাইর (পাখিটি) কী করল?’ (সহিহ বুখারি: ৬২০৩)। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে তিনি কেবল ধর্মীয় নেতা নন, ছিলেন একজন মমতাময় মানুষ।

শিশুদের জন্য দোয়া করতেন নবীজি (স.)

নবীজি (স.) শিশুদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতেন। তিনি মনে করতেন, দোয়া শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনকে আলোকিত করে। আনাস (রা.)-এর মা উম্মে সুলাইম (রা.) একবার নবীজি (স.)-কে অনুরোধ করেন যেন তিনি তার ছেলে আনাস (রা.)-এর জন্য দোয়া করেন। তখন নবীজি (স.) আনাস (রা.)-এর জন্য এই বলে দোয়া করেন- ‘হে আল্লাহ! তার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত দান করুন এবং তাকে দীর্ঘায়ু করুন।’ (সহিহ বুখারি) আয়েশা রা. বলেন- ‘রাসুলে কারিম (স.)-এর নিকট মদিনার শিশুদের নিয়ে আসা হত। নবীজি তাদের জন্য বরকতের দোয়া করতেন। (সহিহ বুখারি: ৬৩৫৫; সহিহ মুসলিম: ২৮৬)

শিশুদের ভুল-ভ্রান্তিতে বিরক্ত না হওয়া

শিশুদের ভুল-ভ্রান্তি স্বাভাবিক। নবীজি (স.) কখনোই তাদের ভুলের কারণে বিরক্ত হতেন না বা বকাঝকা করতেন না। তিনি ধৈর্য সহকারে তাদের ভুল শুধরে দিতেন। একবার হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি ১০ বছর নবীজি (স.)-এর খেদমত করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি আমাকে কখনো কোনো কাজে ‘উফ’ শব্দটি বলেননি। আমি কোনো কাজ করলে তিনি বলতেন না, ‘কেন এটা করলে?’ আর কোনো কাজ না করলে বলতেন না, ‘কেন এটা করলে না?’ (সহিহ বুখারি)। এটি শিশুদের প্রতি তাঁর সর্বোচ্চ ধৈর্যের এক অনন্য উদাহরণ।

আরও পড়ুন: হারিয়ে যাওয়া ২২টি মর্যাদাপূর্ণ সুন্নত

শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া

নবীজি (স.) বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তিনি নিজে শিশুদের খেলাধুলায় অংশ নিতেন এবং তাদের উৎসাহিত করতেন। একবার নবীজি (স.) তাঁর দৌহিত্র হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-কে নিয়ে খেলা করার সময় তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন। এমন সময় তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন- ‘তোমাদের বাহন কতই না উত্তম এবং তোমরা কতই না উত্তম আরোহী!’ (মুসনাদে আহমদ: ১১১৭১) এই ঘটনাটি নবীজি (স.)-এর শিশুদের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রমাণ।

শিক্ষাদান ও আত্মিক বিকাশে গুরুত্ব

শিশুদের প্রতি নবীজি (স.)-এর ভালোবাসা কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য দিকনির্দেশনাও দিতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি একদিন নবীজি (স.)-এর পেছনে উটের পিঠে বসা ছিলেন। নবীজি (স.) তখন তাঁকে বললেন, ‘যখন কিছু চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে।’ (সুনানে তিরমিজি)। এভাবেই তিনি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আত্মিক জ্ঞান ও আল্লাহর উপর ভরসার শিক্ষা দিতেন।

শিশুদের প্রতি নবীজি (স.)-এর ভালোবাসা আজকের সমাজের জন্য এক আলোকবর্তিকা। বর্তমান সমাজে শিশুদের প্রতি অবহেলা, নির্যাতন ও অনাদরের ঘটনা ঘটে। অথচ নবীজির (স.) জীবন আমাদের শেখায়, শিশুরা কেবল ভবিষ্যৎ নয়, তারাও এখনই সম্মান ও ভালোবাসার যোগ্য। আসুন, আমরা তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি এবং শিশুদের দয়া, স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে গড়ে তুলি। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি নৈতিক ও মানবিক সমাজ।