ধর্ম ডেস্ক
০৬ জুন ২০২৪, ০৭:৩২ পিএম
ইসলামে বাজেটকে একটি জাতীয় আমানত হিসেবে দেখা হয়। এই আমানত যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যে সহযোগী হয়, মানুষের জন্য কল্যাণকর হয় সেই বিবেচনা থাকা কর্তব্য। ইসলামি অর্থব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়নের মৌলিক নীতিমালা হলো, সবার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তারপর তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে আসা। ইসলাম অপ্রতুল বিলাসী বাজেট সমর্থন করে না।
পবিত্র কোরআন থেকে আমরা জাতীয় বাজেটের ধারণা পাই। প্রাচীন মিসরে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদি অর্থব্যবস্থা সংরক্ষণের ঘটনা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়েছেন। হজরত ইউসুফ (আ.) দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখতে, আসন্ন সংকট থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা করতে ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনার একটি খসড়া করে দিলেন।
পবিত্র কোরআনের ভাষায় ইউসুফ (আ.) বললেন- قَالَ تَزۡرَعُوۡنَ سَبۡعَ سِنِیۡنَ دَاَبًا ۚ فَمَا حَصَدۡتُّمۡ فَذَرُوۡهُ فِیۡ سُنۡۢبُلِهٖۤ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّمَّا تَاۡكُلُوۡنَ - ثُمَّ یَاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِكَ سَبۡعٌ شِدَادٌ یَّاۡكُلۡنَ مَا قَدَّمۡتُمۡ لَهُنَّ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّمَّا تُحۡصِنُوۡنَ - ثُمَّ یَاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِكَ عَامٌ فِیۡهِ یُغَاثُ النَّاسُ وَ فِیۡهِ یَعۡصِرُوۡنَ ‘তোমরা সাত বছর উত্তম রূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে, অবশিষ্ট শস্য শীষসহ রেখে দেবে এবং এরপরে আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্য যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে। কিন্তু অল্প পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা তুলে রাখবে। এর পরেই আসবে এক বছর-তখন মানুষের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন তারা রস নিংড়াবে।’ (সুরা ইউসুফ: ৪৭-৪৯)
এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নবী ইউসুফ (আ.) ১৪ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন এবং আসন্ন দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলায় দেশের উৎপাদন ও আয়-ব্যয়ের হিসাব করে দিয়েছেন। ইউসুফ (আ.)-এর আল্লাহ প্রদত্ত এই অভূতপূর্ব পরামর্শে বিমোহিত হয়ে বাদশাহ তাকে নিজের একান্ত সহযোগী হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব করলেন। মহান আল্লাহ বলেন- وَ قَالَ الۡمَلِكُ ائۡتُوۡنِیۡ بِهٖۤ اَسۡتَخۡلِصۡهُ لِنَفۡسِیۡ অর্থ: বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখব। (সুরা ইউসুফ: ৫৪)
আরও পড়ুন: পবিত্র কোরআনে কার নাম কতবার এসেছে
ইসলাম আয় ও ব্যয়ে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলে। মধ্যপন্থা অবলম্বনের কথা বলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা অপচয়। আর অবৈধ কাজে ব্যয় করা হলো অপব্যয়। দুটোই ইসলামে দোষণীয় ও নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন- وَّ كُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا وَ لَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّهٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ অর্থ: তোমরা আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। (সুরা আরাফ: ৩১) আরও ইরশাদ হয়েছে- وَ اٰتِ ذَاالۡقُرۡبٰی حَقَّهٗ وَ الۡمِسۡكِیۡنَ وَ ابۡنَ السَّبِیۡلِ وَ لَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا - اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ كَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَ كَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّهٖ كَفُوۡرًا অর্থ: তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সুরা ইসরা: ২৬-২৭)
তাই জাতীয় সুফল পেতে হলে অপব্যয় অপচয় থেকে সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে বেঁচে থাকতে হবে। আয়-ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা না থাকলে দরিদ্রতা এগিয়ে আসে। অনেক সময় ঋণগ্রস্ত হয়ে বাস্তুভিটাও হারিয়ে যেতে পারে। আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা থাকলে সাধারণত অভাব আসে না। মহান আল্লাহ বলেন- وَ لَا تَجْعَلْ یَدَكَ مَغْلُوْلَةً اِلٰی عُنُقِكَ وَ لَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا ‘তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হইয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হইয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। নবীজি (স.) বলেন- যে ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না। (মুসনাদে আহমদ: ৪২৬৯)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো আপস করা যাবে না। দুর্নীতি ও আর্থিক পাপের কারণে ইবাদতও নষ্ট হয়ে যায়। ইসলামে যার ইবাদত নষ্ট হয়, সেই প্রকৃত গরিব। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি (স.) বলেন- আমার উম্মতের মধ্যে দরিদ্র ওই ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাত নিয়ে আসবে। সে আরও নিয়ে আসবে অন্যকে এই পরিমাণ গালি দিয়েছে, এই পরিমাণ মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এই পরিমাণ সম্পদ খেয়েছে, এই পরিমাণ রক্ত প্রবাহিত করেছে, অন্যকে এই পরিমাণ প্রহার করেছে। তার নেকি থেকে এই পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্তকে প্রদান করতে হবে। তার দায় শেষ হওয়ার আগেই তার নেকি শেষ হয়ে যাবে। তখন ক্ষতিগ্রস্তদের পাপ থেকে এই পরিমাণ নিয়ে তার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। (মুসলিম: ৬৭৪৪)
আরও পড়ুন: নেকি খেয়ে ফেলে যে ৬ গুনাহ
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ইবাদত হলো জাকাত। যেটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করে। দারিদ্র্য দুর করতে সবচেয়ে বড় ভুমকা রাখে। সম্পদশালী মুসলিম নর-নারীর ওপর বছর শেষে তার সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রদান করতে হয়। জাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে প্রকৃত অর্থে জীবন মানের উন্নয়ন হবে। পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা দরকার আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। সুষম বণ্টনের অভাবে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। জাকাত এই বৈষম্য দূর করে সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে।
মহান আল্লাহ বলেন- إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‘নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে এবং সংশোধনমূলক সৎকর্ম করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং জাকাত প্রদান করে তাদের জন্য তাদের প্রভুর কাছে তাদের পারিতোষিক আছে। আর তাদের কোনো ভয় থাকবে না আর তারা দু:খিতও থাকবে না।’ (সুরা বাকারা: ২৭৭)
বাজেট প্রণয়নে ইসলামের এ মহান শিক্ষা আত্মস্থ করতে পারলে এবং যাপিত জীবনে অনুসরণ করতে পারলে বিশ্ব অর্থনীতি ও দেশীয় অর্থনীতির শত সংকটেও উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর ব্যক্তিজীবনে প্রতিটি মানুষ ভারসাম্য রক্ষা চললে জাতীয় বাজেট থাকবে চাপমুক্ত। সবার কর্তব্য, হালাল সম্পদ উপার্জনের পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।