images

ইসলাম

সন্তানের প্রতি মা-বাবার ১১ দায়িত্ব

মো. মারুফুল আলম

০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৫২ পিএম

সন্তান বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অন্যতম সেরা উপহার। তিনি যাকে খুশি এই উপহার দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি যাকে খুশি সন্তান দান করেন এবং যাকে খুশি পুত্রসন্তান দান করেন। যাকে খুশি কন্যা ও পুত্র উভয়টি দান করেন। যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশালী।’ (সুরা আশ-শুরা: ৪৯)

পবিত্র কোরআনে সন্তানকে মানবজীবনের সৌন্দর্য বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তানাদি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।’ (সুরা কাহাফ: ৪৩)

এই উপহার ও সৌন্দর্য পেয়ে আনন্দের আতিশয্যে খেয়ালখুশিমতো বড় করলে হবে না। তাদের প্রতি বাবা মায়ের দায়িত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে...। (বুখারি: ৬৬৫৩; সুনানে আবু দাউদ: ২৯২৮) আরেক হাদিসের ঘোষণা- আল্লাহ তাআলা যদি বান্দাকে কারো দায়িত্বশীল বানান আর সে নিজ অধীনস্থদের কল্যাণের ব্যাপারে যত্নশীল না হয়, তাহলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। (সহিহ বুখারি: ৭১৫০)

নিম্নে সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের বিশেষ দায়িত্বগুলো তুলে ধরা হলো।

১. কানে আজান ও একামত দেওয়া
সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, তার ডান কানে আজান দেওয়া এবং বাম কানে একামত দেওয়া সুন্নত। ফাতিমা (রা.) যখন আলী (রা.)-এর ছেলে হাসান (রা.)-কে প্রসব করলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তার ডান কানে নামাজের আজানের ন্যায় আজান দিয়েছিলেন এবং বাম কানে ইকামত দিয়েছিলেন। (শুআবুল ইমান: ৮৬২০)
হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন যে যার সন্তান হয়, সে যেন তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেয়। (শুআবুল ইমান: ৮৬১৯)

azan

২. সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা
মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে নামের মাধ্যমে। দুনিয়ার এ নামেই পরকালে তাকে ডাকা হবে। এ নামের প্রভাব পড়ে জীবন চলার পথে ও বংশের মধ্যে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমরা যখন আমার কাছে কোনো দূত পাঠাবে তখন সুন্দর চেহারা ও সুন্দর নামবিশিষ্ট ব্যক্তিকে পাঠাবে।’ (জামে তিরমিজি: ২৮৩৯)

৩. আকিকা ও সদকা
বাবা-মার দায়িত্ব হলো সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে নবজাতকের দেহের ময়লা পরিষ্কার করা, চুল কাটা, চুলের ওজনের সমপরিমাণ রুপা দান এবং সন্তান লাভের শুকরিয়া হিসেবে আকিকা করা। আর এটি সুন্নত। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) হজরত হাসান (রা.)-এর পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা! তার মাথা মুণ্ডন করো এবং চুল পরিমাণ রুপা সদকা করো।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৫১৯)

৪. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
মানবশিশু অত্যন্ত অসহায় ও দুর্বল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। মা-বাবা সন্তানের বেড়ে ওঠা নিরাপদ করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। তাদের এবং তোমাদের জীবিকা আমিই দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৩১)

muslim-dad

৫. আদর যত্ন করা ও ভালোবাসা
শিশুর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা পরিহার করতে হবে। কেননা এতে সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে, যা মানসিক বিকাশে বাধা। তাকে ভালোবাসা দিয়ে বড় করতে হবে। নবীজি (স.) শিশুদের আদর করতেন, তাঁর উম্মতকেও বলে গেছেন শিশুদের আদর করতে। (বুখারি: ৫৬৫১)
রাসুলুল্লাহ (স.) শিশুদের সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গ আচরণ করতেন, তাদের সঙ্গে খুব সহজভাবে মিশতেন। হাদিসে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) আব্বাস (রা.)-এর ছেলে আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ ও কুসায়্যারকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে বলতেন, আমার নিকট যে আগে পৌঁছতে পারবে, তাকে এমন এমন পুরস্কার দেওয়া হবে। তখন তারা দৌড়ে এসে রাসুল (স.)-এর পিঠ ও বুকের ওপর উঠে যেত। রাসুলুল্লাহ (স.) আদর করে তাদের চুমু খেতেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৮৩৬)

muslim-mom-and-child

৬. ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া
শিশুদের ঈমান-আকিদা, বোধ-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, আমল-আখলাক, জীবন যাপন প্রভৃতির ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া মা-বাবার কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশুই ফিতরাত তথা ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর মা-বাবা তাকে ইহুদি বা খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজারিতে পরিণত করে। (মেশকাত: ৯০; বুখারি: ১৩৫৮; মুসলিম: ২৬৫৮)

৭. আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া
মা-বাবা শৈশবেই সন্তানকে বিনয়, সততা, ভদ্রতা, সত্যবাদিতা, স্নেহ, শ্রদ্ধা, সদাচার প্রভৃতি সুনীতি ও সদাচার শিক্ষা দেবেন। সেজন্য রাসুলুল্লাহ (স.) মা-বাবাকে দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘সন্তানকে দেওয়া পিতার সর্বোত্তম উপহার হলো শিষ্টাচার।’ (তিরমিজি: ১৯৫২) পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আর মহা পুরস্কার রয়েছে আল্লাহরই কাছে।’ (সুরা আনফাল: ২৮)

muslim-girl

৮. শিরক ও কুফরি থেকে দূরে রাখা
শিরক ও কুফরি অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। সেজন্য মা-বাবা সন্তানের অত্যন্ত উপযোগী যুক্তিতে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞানদান করবেন। হজরত লোকমান (আ.) তার সন্তানকে শিরক থেকে দূরে থাকার নসিহত করেছেন, যা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে তুলে ধরেছেন- ‘হে আমার সন্তান। তুমি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করো না। নিশ্চয়ই শিরক অত্যন্ত ভয়াবহ জুলুম।’ (সুরা লোকমান: ১৩)

learning-muslim-boy

৯. বিয়ে দেওয়া ও স্বাবলম্বী করা
সন্তান বিয়ের উপযুক্ত হলে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে (চরিত্র রক্ষার জন্য যদি বিয়ে করে তবে) আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ (সুরা নুর: ৩২)

১০. সৎ নসিহত দেওয়া
জীবনের চলার পথে সন্তান কোন আদর্শ ও নীতির অনুসরণ করবে, সে ব্যাপারে বাবা-মা নসিহত করবেন। লোকমান (আ.)-এর নসিহত তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার সন্তান! তুমি নামাজ কায়েম করো, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং বিপদে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় ধৈর্যধারণ করা সাহসিকতার কাজ। অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যম পথ অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু রাখো। নিঃসন্দেহে গাধার কণ্ঠই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’ (সুরা লোকমান: ১৭-১৯)

১১. দোয়া করা
মা-বাবার আরেকটি দায়িত্ব হলো, সন্তানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া কবুল করেন। পবিত্র কোরআনে চক্ষু শীতলকারী সন্তান লাভের দোয়া শেখানো হয়েছে; যারা উত্তম স্ত্রী ও সুসন্তান লাভের দোয়া করে, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা বলে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের চক্ষু শীতলকারী স্ত্রী ও সন্তান দান করুন। আমাদের আল্লাহভীরু মানুষের নেতা নির্বাচিত করুন। (সুরা ফোরকান: ৭৪)

dua

মনে রাখা জরুরি, সন্তান শুধু পার্থিব জীবনের সম্পদ নয়, পরকালীন জীবনেও তার কারণে মা-বাবা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ জান্নাতে নেককার বান্দার মর্যাদা সমুন্নত করবেন, তখন সে বলবে, হে আমার রব, কেন আমার জন্য এই উচ্চ মর্যাদা? তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে।’ (মুসনাদ আহমদ: ১০৬১০)

রাসুল (স.) আরও বলেছেন, ‘যখন মানুষ মারা যায়, তিনটি বিষয় ছাড়া তার অন্য সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তা হলো সদকায়ে জারিয়াহ, এমন জ্ঞান মানুষ যার দ্বারা উপকৃত হয় এবং সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (মুসলিম: ১৬৩১)

বর্তমান যুগে অনেক মা-বাবা জানেন না সন্তানকে কী বিষয় শিক্ষা দেবেন। এ অবস্থায় নিজেদেরও প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে তাওহিদ, রেসালাত, ঈমান, কুফর সম্পর্কে জানা জরুরি। এরপর সন্তানকে আদব-আখলাক এবং দ্বীনি শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে খাঁটি মুমিন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সন্তানদেরকে আলেমদের সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়াও প্রয়োজন। কেননা তাঁদের ব্যক্তিত্ব, উপদেশ ও দোয়া সন্তানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তা হতে পারে তার জন্য অমূল্য সম্পদ। 

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সন্তানদের রাসুলে আকরাম (স.)-এর দরবারে নিয়ে যেতেন। এই ধারা পরবর্তী ওলামায়ে কেরামের মধ্যেও অব্যাহত ছিল। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সন্তানদের সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার এবং আল্লাহর আমানতের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।