Dhaka Mail Logo

প্রবাস / সারাদেশ

কলকাতায় হোটেল আগুন: সাতক্ষীরার দুই পরিবারে শূন্যতার হাহাকার

জেলা প্রতিনিধি

২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম

চলছিল বাড়ি নির্মাণের কাজ। একতলা ঘর ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় তলা নির্মাণের জন্য আনা হয়েছে ইট। অপেক্ষা ছিল নতুন করে ঘর সাজানোর। কিন্তু যে মানুষটির জন্য বাড়িটিতে দ্বিতীয় তলা উঠবে, সেই আলিমুজ্জামান সাজু আর ফিরবেন না।

দরজার সামনে পড়ে আছে স্তূপ করে রাখা ইট। বাড়ির ভেতরে চলছে নীরব প্রস্তুতি। অথচ সেই বাড়ির মালিকের ফেরার অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে শোকের অপেক্ষায়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার দুই বাসিন্দা। তাদের একজন উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫)। তিনি পেশায় ঘের ব্যবসায়ী। অপরজন তেঁতুলিয়া গ্রামের ভবেশ সরকারের স্ত্রী রেবতী সরকার।

বুধবার রাত ১০টার দিকে সাজুর মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে বরেয়া গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের চোখে-মুখে তখন শুধু বিষাদের ছাপ।

সাজুর বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে ছিলেন। সাজু ভারতে যাওয়ার আগে বাড়ির দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে গিয়েছিলেন।

ইসমাইল হোসেন বলেন, ওই বাড়িটা আমি দেখাশোনা করতাম। ইট নিয়ে আসা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে আমরা কাজ শুরু করব, এমন কথা ছিল। উনি বলেছিলেন, ‘আমি ইন্ডিয়া থেকে আসি, ঘের-বেড়ি ওই দিকে তুই দেখিস, আমি এসে কাজে হাত দেব।’ কিন্তু এর মধ্যেই দুর্ঘটনা হয়ে গেল। এখন আর কী করতে পারি, কী বলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

কথা বলতে বলতে থেমে যান ইসমাইল। যে বাড়িতে সাজুর ফিরে এসে দ্বিতীয় তলার কাজে হাত দেওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন তার ফেরার অপেক্ষা নেই।

সাজুর বড় ভাই সাহেব আলী সরদার বলেন, অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা নিতে ভারতে গিয়েছিলেন তার ভাই। কলকাতার একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য কলকাতা গিয়েছিল। হোটেলে ছিল। হঠাৎ জানতে পারি, সেখানে আগুন লেগেছে। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হই, আমার ভাই মারা গেছে। এরপর বাংলাদেশ সরকারের হটলাইনে যোগাযোগ করেছি। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার ভাইয়ের লাশটা যেন দ্রুত দেশে এনে দেওয়া হয়।

সাজুর বুধবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হলো না।

সাজুর প্রতিবেশী নাজমুল হুদা বলেন, জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তবে এমন অপঘাতে মৃত্যু পরিবার ও গ্রামের মানুষের মনে দীর্ঘদিন দাগ হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, সাজু দাদা অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ ছিলেন। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। তার এভাবে চলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারছি না।

কলকাতার যে হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নাজমুল হুদার ভাষায়, দেশবাসী ও সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং সেখানে কী ঘটেছিল, সেই সঠিক তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক। এমন অব্যবস্থাপনার কারণে আর কোনো পরিবারের আপনজন যেন এভাবে মারা না যান।

সাজুর আরেক প্রতিবেশী অঞ্জলি মণ্ডল বলেন, প্রায় তিন মাস আগে সাজু ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। পরে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এরপর আবার প্রায় ১০-১৫ দিন আগে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভারতে যান।

অঞ্জলি মণ্ডল বলেন, ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বুধবার রাতে খবর পেলাম, উনি মারা গেছেন। আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি। পুরো এলাকা শোকে আছে।

আরেক প্রতিবেশী বলেন, সাজুর সঙ্গে এলাকার সবার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে ভালোভাবে মিশতেন, ভালো কথাবার্তা বলতেন। তার সম্পর্কে কখনো খারাপ কিছু দেখিনি বা শুনিনি। কিন্তু সেখানে আসলে কী হয়েছে, সেটা তো আমরা জানি না।

অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া অপর বাংলাদেশি রেবতী সরকারও কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভবেশ সরকারের স্ত্রী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন রেবতী। কলকাতার ওই হোটেলে অবস্থানকালে অগ্নিকাণ্ডে তার মৃত্যু হয়।

তার বাড়িতে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। 

স্থানীয়রা জানায়, রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার মঙ্গলবার ঢাকায় ভিসা সেন্টারের কাজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।

একদিকে সাজুর বাড়িতে দ্বিতীয় তলার জন্য আনা ইট, অন্যদিকে রেবতীর তালাবদ্ধ বাড়ি, দুটি বাড়িতেই এখন অপেক্ষা শুধু স্বজনের মরদেহ ফিরে আসার।

জেলা প্রশাসক কাওসার আজিজ বলেন, কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে একজনের মৃত্যুর বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। তার লাশ দেশে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন কাজ করছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, আমরাও খোঁজ-খবর রাখছি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা সহযোগিতা করব।

অপর নারীর লাশ দেশে আনার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত দুইটার দিকে কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রথমে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে। সব মিলিয়ে নয়জনের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। হোটেলটিতে প্রায় ২৫ জন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।

কলকাতার সেই আগুন শুধু একটি হোটেল পুড়িয়েছে, এমন নয়। সাতক্ষীরার দুটি পরিবারেও রেখে গেছে অনন্ত শূন্যতা।

প্রতিনিধি/এলএ