ফিচার প্রতিবেদক
২৮ মে ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম
বাংলাদেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যখন ঈদের আনন্দধারা, কোরবানির পশুর হাঁক-ডাক আর উৎসবের আমেজ—ঠিক তখন সুদূর প্রবাসের এক টুকরো আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন লাখো বাঙালি। রেমিট্যান্সের টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকলেও, এই প্রবাসীদের জীবনের আনন্দের চাকা যেন সেখানে থমকে আছে। এবারের ঈদুল আজহায় এমন লাখো প্রবাসীর গল্পগুলো যেন এক একটি নীরব অশ্রুভেজা উপাখ্যান।
সালাহউদ্দিন তনু। ঈদের ঠিক একদিন আগেই পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায়। জীবনের প্রথম বিদেশের মাটিতে ঈদ কাটাতে গিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা যেন কোনো এক রূপকথার উল্টো পিঠ। গত বছরগুলোতে দেশের বাড়িতে কোরবানির ঈদ ছিল তনুর জন্য এক মহোৎসব। পরম উৎসাহে গরু কেনা, মাংস কাটা, আর আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে মাংস বিলি করার মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। অথচ আজ তিনি হাজার মাইল দূরে।
ফেসবুকে তনুর এক স্বজন তাকে ট্যাগ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন, যা পড়লে যে কারো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। পোস্টে লেখা হয়েছে, "কয়েক বছর আগে এক কোরবানিতে তুই আমাদের বাসায় নিজে হাতে মাংস দিয়ে এসেছিলি। আজ তুই নেই, আমাদের বাড়িতে সেই কোরবানির মাংসের স্বাদও যেন হারিয়ে গেছে।"
তনুর মতো হাজারো মানুষের গল্পটা একই সুতোয় গাঁথা। পরিবারের জন্য কোরবানির গরু-ছাগল কেনার টাকা হয়তো তারা সময়মতো পাঠিয়েছেন। দেশে তাদের পরিবারের সদস্যরা সেই টাকায় কোরবানিও দিয়েছেন, কিন্তু প্রবাসে থাকা মানুষটির ভাগ্যে জুটছে না এক টুকরো কোরবানির মাংস। যে মানুষটি একসময় অন্যের ঘরে মাংস পৌঁছে দিয়ে আনন্দ পেতেন, আজ তিনিই প্রবাসের ব্যস্ততা আর নিয়মকানুনের বেড়াজালে বন্দী। সেখানে কোরবানির আয়োজন করা কিংবা এক টুকরো মাংস চেখে দেখা—সবই যেন এক অলীক কল্পনা।
আরও পড়ুন: নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদের অন্যরকম ঈদ
প্রবাসে থাকা এই মানুষগুলোর ঈদ কাটে এক অদ্ভুত নিরানন্দে। কর্মস্থলের একঘেয়েমি, আপনজনহীন পরিবেশ আর শেকড়ের টান তাদের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। এদিকে, দেশে থাকা স্বজনরাও কম কষ্টে নেই। যে প্রিয় মানুষটির হাত ধরে বাড়ির ঈদ আনন্দ পূর্ণতা পেত, সেই মানুষটিকে ছাড়া তারাও নীরবে চোখের জল ফেলেন। কোরবানির দিন বাড়িতে যখন আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-দুঃখীরা ভিড় জমায়, তখন পরিবারের সবার চোখ খুঁজে ফেরে সেই মানুষটিকে, যে বিদেশে বসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাচ্ছে।
রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের এই ত্যাগের কোনো পরিমাপ নেই। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে তারা বিসর্জন দিচ্ছেন নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো, বিসর্জন দিচ্ছেন ঈদের আনন্দটুকুও। তনুর মতো লাখো প্রবাসীর জন্য ঈদ মানে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র, কিন্তু তাদের হৃদয়ের গহীনে রয়ে যায় স্বজন আর দেশের মাটির জন্য এক অনন্ত হাহাকার।
শহরের কোলাহল আর পরবাসের এই নির্জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে আজ হয়তো অনেকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—কবে ফিরবেন? কবে আবার নিজের হাতে কোরবানির গরু কিনে পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন ঈদের সেই পুরোনো আনন্দ? সেই অপেক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হতে চায় না।
হাজারো প্রবাসীর মনে আজ বাজে একটাই সুর, একটিই হাহাকার— "এবার ঈদেও হয়নি ফেরা ঘরে, প্রিয়জন ছাড়া ঈদ কাটে মোর একলা দূর প্রবাসে..."।
এজেড