Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, বদলেছে শুধু ক্ষমতার চেয়ার: নাহিদ ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণঅভ্যুত্থানকে কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তন হিসেবে দেখেছে। ফলে ক্ষমতার চেয়ার ও মানুষ বদলালেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি।

রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে জাতীয় যুবশক্তি আয়োজিত জাতীয় যুব সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। কিন্তু আট মাস পার হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। বরং সরকারি দলের নেতাকর্মীদের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বেকার তরুণদের জন্য বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে তোলা, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সরকারের নিয়োগপ্রক্রিয়ার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত আট মাসে প্রশ্নফাঁস ও দলীয় নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেও দলীয় লোক বসানোর চেষ্টা চলছে। অথচ সরকারি চাকরিতে বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। দলীয় পরিচয়ে চাকরি দেওয়া গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে এই সরকারের পরিণতিও পতিত স্বৈরাচারী সরকারের মতো হতে পারে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার তরুণ উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা না করে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দখলদারদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। গণমাধ্যমে এসব ঘটনা প্রকাশিত হলে কাউকে পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছে, যা সমস্যার সমাধান নয়।

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ চার সদস্যের একটি পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে মাসে ৪৬ থেকে ৪৭ হাজার টাকা প্রয়োজন বলে বেসরকারি গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পোশাকশিল্প থেকে। এ খাতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের অর্ধেকের বেশি নারী। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ব্যবহার না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে বলেও দাবি জানান তিনি।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার সেই রায় উপেক্ষা করছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, অতীতে এ ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন করলেও এখন ক্ষমতায় এসে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের পছন্দের লোক বসানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছে এনসিপি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুবশক্তি, ছাত্রশক্তি ও স্বেচ্ছাসেবক শক্তির নেতাকর্মীদের পাড়া-মহল্লা থেকে জেলা-উপজেলায় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতির কথা বললেও বাস্তবে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারছে না। ভারত ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। জাপানের সঙ্গে মাতারবাড়ী প্রকল্পের সমঝোতা বা চুক্তির বিষয়টি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। সংসদে আলোচনা ছাড়া কোনো জাতীয় চুক্তি অনুমোদন করা উচিত নয়। ভারতকে অবৈধ করিডর বা ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হলে জনগণ তা প্রতিহত করবে।

আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যার পাশাপাশি নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা বজায় রাখার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ভারত ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করলে প্রয়োজনে মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চের মতো কর্মসূচি নেওয়া হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পানির ন্যায্য হিস্যা ও সীমান্তের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানির ন্যায্য হিস্যা না পেলে ট্রানজিট, করিডর ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নও আসবে না। দেশের নদী, সাগর, সীমান্ত ও সম্পদ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ সময় তিনি বলেন, দিল্লি নয়, ঢাকা; ভারত নয়, বাংলাদেশ—দেশের স্বার্থই সবার আগে।

শহীদ আবরার ফাহাদের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কথা বলার কারণে আবরার ফাহাদকে জীবন দিতে হয়েছিল। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রয়োজনে আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত তারা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের এক বছর হতে চললেও বিচার নিশ্চিত হয়নি। হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কার্যকর অগ্রগতি নেই। জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়াও ধীর হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করছে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, অতীতের রাজনৈতিক মামলাগুলোকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখনো নিরীহ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও তরুণদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুবশক্তিকে সারা দেশের জেলা, উপজেলা ও এলাকায় সংগঠিত হতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অসমাপ্ত দাবি বাস্তবায়ন ও নতুন রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা রাখতে হবে।

আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সারা দেশে এনসিপির কর্মসূচি থাকবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিজয়ের মাসে নতুন বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরতে চান তারা। দেশের মানুষ নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে তরুণদের ভয় না পেয়ে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এম/এআর