নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা, এ ঘটনায় স্থানীয় এমপিপুত্রের সংশ্লিষ্টতা, ২০ লাখ টাকায় সমঝোতার চেষ্টা- সার্বিক বিষয়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
মিরপুরে-রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, অস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেন ও তার এক সহযোগীর মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়া, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ পোস্টে এসব নিয়ে সমালোচনা করেছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা, এ ঘটনায় বিএনপির এমপিপুত্র গ্রেফতারের বিষয়টি তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘সমঝোতার জন্য বিএনপির এমপি ২০ লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। কী বিচিত্র রাজনীতি!’
তিনি বলেন, ‘দুঃসময়ে নেতাদের ঠিকানা লন্ডন কিংবা ভারত, কর্মীদের ঠিকানা রাজপথ কিংবা কারাগার। সুসময়ে নেতারা ক্ষমতার মসনদে, কর্মীরা স্লোগানের মিছিলে। দুঃসময়ে মার খাবেন কর্মীরা, সুসময়েও প্রাণ দেবেন তারাই! কর্মীর জীবনের দাম বিশ লাখ, নেতার ক্ষমতার দাম অমূল্য! যে কর্মীর কাঁধে চড়ে ক্ষমতায় ওঠা, শেষ পর্যন্ত তার কাঁধেই কফিন তুলে দেওয়া হয়।’
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর এবং ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ড নিয়ে পাটওয়ারী বলেছেন, ‘মিরপুরে গরিবের মা ও শিশুদের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, কোটি টাকার হামলার পরিকল্পনায় বিএনপি নেতার নাম। এদিকে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের হাতে পিস্তল, পাশে সহযোগীর হাতে বিশাল একখানা আগ্নেয়াস্ত্র। প্রশ্ন হলো, সহযোগীর অস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স আছে কি না, পুরো ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগে পুলিশের তালিকায় ৮৩ শতাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাক কুঁচকে বলছেন, বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ নাকি ঢালাও! প্রতিদিন কোথাও না কোথাও চাঁদাবাজির খবর, আর মন্ত্রী ব্যস্ত অভিযোগের ব্যাকরণ সংশোধনে। কী চমৎকার প্রশাসনিক সাহিত্যচর্চা!’
প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সমালোচনার কারণে ৩০ জন সাধারণ মানুষকে কারাগারে যেতে হয়েছে উল্লেখ করে পাটওয়ারীর প্রশ্ন, ‘সমালোচনার জবাব দেওয়ার বদলে যদি মামলা আর কারাগারই সামনে আসে, তাহলে গণতন্ত্রের সঙ্গে রাজদরবারের পার্থক্য কোথায়?’
এনসিপি নেতা বলেন, ‘মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আর সমালোচনার বেলায় কারাগারের দরজা। হীরক রাজাও বোধ হয় এমন বৈপরীত্য দেখে মুচকি হাসতেন! সেখানে রাজাকে প্রশ্ন করলে মগজ ধোলাই হতো, এখানে প্রশ্ন করলেই কারাগারের ঠিকানা। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে বটে, শাসনের দর্শনটা যেন একই রয়ে গেছে!’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘একজন ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছি আমরা, যার প্রধান দায়িত্ব মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ একের পর এক সহিংসতা, চাঁদাবাজি আর দখলদারত্বের ঘটনা দেখে মানুষ ক্রমেই ক্ষুব্ধ, হতাশ ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে।’
পাটওয়ারী বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘুম কি তবে সেদিনই ভাঙবে, যেদিন পুঞ্জীভূত জনরোষ আবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো বিস্ফোরিত হবে? জনগণ নিরাপত্তা চাইছে, আর রাষ্ট্র যেন অপেক্ষা করছে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হলে তাকে পরিস্থিতি বলা যায়!’
আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একসময় সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য যা-ই হোক, ছেলে ক্ষমতায় এসেও মায়ের ঘোষিত অবস্থানের মর্যাদা রাখতে পারেননি। ক্ষমতার উত্তরাধিকার গ্রহণ করা সহজ, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দায় বহন করা কঠিন। ইতিহাস এই ব্যর্থতার হিসাবও রাখবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু দরবারি বিবেকবিক্রেতা? হাসপাতাল ভাঙে, মানুষ খুন হয়, অস্ত্রের প্রদর্শনী চলে, সমালোচনাকারী কারাগারে যান। অথচ তাদের বিবেকের ঘুম ভাঙে না। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে বোধ হয় অন্যায়ের শব্দও মধুর শোনায়। যে বিবেক ক্ষমতার রং দেখে জাগে, তাকে বিবেক না বলে দরবারি অ্যালার্ম ঘড়ি বলাই ভালো!’
পাটওয়ারী বলেন, ‘হীরক রাজার দেশে মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র ছিল। এখানে যন্ত্রের দরকার নেই, ক্ষমতার সান্নিধ্যই অনেকের বিবেক ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। সেখানে রাজদরবারে সত্য বলার লোকের অভাব ছিল, এখানেও যেন সত্য বলার আগে সবাই সিংহাসনের দিকে একবার তাকিয়ে নেন।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘রাজা বদলালেই রাজত্ব বদলায় না। বদলাতে হয় রাজত্বের নিয়ম। নইলে সিংহাসনে নতুন মুখ বসে, দরবারে নতুন স্তাবক আসে, শুধু পুরনো ভোগান্তিই প্রজার ভাগ্যে জোটে। হীরক রাজার দেশেও রাজা ছিলেন একজন, কিন্তু রাজত্ব টিকিয়ে রেখেছিল গোটা দরবার।’
এএইচ