২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
আজকের দিন পেরিয়ে রাত পোহালেই বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ। শেষ মুহূর্তে মুখোমুখি অবস্থানে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দুই দলেই রয়েছে শক্ত প্রার্থী। ভোটকে সামনে রেখে তাই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এখন উত্তেজনা চরমে।
রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া এ আসনে জিতে নিজেদের মর্যাদা রক্ষায় মরিয়া সরকারি দল বিএনপি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতাকে সংসদে পাঠানোর লক্ষ্যে আসনটি ছিনিয়ে নিতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছে জামায়াত।
নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দাবি এবং ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ- সবমিলিয়ে এই নির্বাচন উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন। ফলে আসনটি ঘিরে দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আসনটি পুনরুদ্ধারের মধ্যদিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
অন্যদিকে আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেলাওয়ার হোসেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এই নেতাকে সংসদে পাঠানোর লক্ষ্যে মাঠে রয়েছে দলটি।
ফলে উপনির্বাচনটি কেবল একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; দুই দলের রাজনৈতিক শক্তি, সাংগঠনিক সামর্থ্য এবং ভোটারদের সমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ভোটের আগে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দুই দলের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলামের কাছে আলাদাভাবে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন ও বিএনপির প্রতিনিধিরা। সেসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরিতে পক্ষপাতিত্ব।
রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের অভিযোগ, নির্বাচনি প্রচারণা শেষ হওয়ার পরও স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা ইএসডিওর কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছে। সেখানে তাদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রভাবিত করা হয়েছে বলে দাবি। জামায়াত প্রার্থীর ভাষ্য, প্রচার শেষ হওয়ার পর এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচনি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন দেলাওয়ার হোসেন। তার অভিযোগ, তালিকায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়োগে এমন পক্ষপাতিত্ব থাকলে ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
এছাড়া আখানগরের বলিতাপাড়ায় জামায়াতের নির্বাচনি উঠান বৈঠকে বিএনপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন এই প্রার্থী। তার দাবি, ওই ঘটনায় জামায়াতের নেতাকর্মীরা আহত হলেও তারা কোনো বিচার পাননি। উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘হামলা ও ভাঙচুর হলো আমাদের ওপর, আমাদের লোক আহত হলো, অথচ কোনো বিচার না পেয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
ভোটের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের এই প্রার্থী। তার অভিযোগ, ঠাকুরগাঁও পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে- তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। এমনকি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকবেন কি না, সেটিও ভোটের দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান দেলাওয়ার হোসেন।
জামায়াতের অভিযোগ অস্বীকার বিএনপির
জামায়াত প্রার্থীর অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকা নিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তারাও অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির প্রতিনিধি ও পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. আতাউর রহমান।
তার দাবি, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তালিকায় জামায়াত-ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে প্রতিপক্ষ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে হামলা, ভাঙচুর ও নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে আতাউর রহমান বলেন, ‘বিএনপি বড় রাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তাদের অসংখ্য সমর্থক রয়েছেন। বড় নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে।’
তবে এসব ঘটনা যেন নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে সতর্কতা রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিপক্ষ কোনো উসকানি দিলেও যেন ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলে নির্বাচন সুষ্ঠু রাখা হয়, সে কথাও জানান বিএনপির এই নেতা।
দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগে ভোটের আগের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভোট পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রচারণা শেষ, নজর ভোটের মাঠে
নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৮টায় সব ধরনের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। এখন ভোটগ্রহণ এবং ফলাফলের অপেক্ষা। যদিও ভোটারদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাওয়া, ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে দুই দলের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
ঠাকুরগাঁও সদর, ভূল্লী ও রুহিয়া উপজেলা নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসন গঠিত। এখানে রয়েছে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা কিছুটা বেশি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসনের ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিকে অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পারেন, সেটিই প্রশাসনের অগ্রাধিকার।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনও জানিয়েছেন, নির্বাচনে কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না। ফলাফল যে প্রার্থীর পক্ষেই যাক, সবাই তা মেনে নেবেন বলে প্রত্যাশা তার। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব বলেও আশাপ্রকাশ করেছেন তিনি।
এদিকে নির্বাচনি এলাকায় বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. সুরুজ মিয়া জানিয়েছেন, ভোটাররা যাতে নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি মোতায়েন থাকবে। ম্যাজিস্ট্রেটও থাকবেন বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
রাজনৈতিক মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্বের লড়াই
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই উপনির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করা আসনে তার ভাইকে বিজয়ী করতে পারলে দলটি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটার সমর্থনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে। সে কারণে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখা এবং ভোটের দিন তা ব্যালটে প্রতিফলিত করাই বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জামায়াতের লক্ষ্য এই আসনে জয়ী হয়ে সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো। দলটির প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে অভিযোগগুলোও শেষ মুহূর্তে সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ এবং ভোটের দিন পরিস্থিতি কেমন থাকে, তা জামায়াতের নির্বাচনি কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে দুই দলের অভিযোগ ও পাল্টা দাবিগুলো প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে- এমন নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে ভোটের আগে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সবমিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ মুহূর্তে আরও তীব্র হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেন এবং প্রশাসন কতটা শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করতে পারে।
টিএই/এএইচ