Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

মানিক পশারীর দাফন নিয়ে তাসনিম জারার পোস্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

পিরোজপুরের সাবেক সংষদ সদস্য ও আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি বক্তা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীরা বাধা দিয়েছেন অভিযোগ করে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডা. তাসনিম জারা।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে এক লম্বা পোস্টে মানিক পশারীর মরদেহ দাফনের ঘটনায় নিজের মতামত তুলে ধরেছেন তিনি।

জারার এই পোস্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা। কেউ কেউ তার প্রশংসা করেছেন, কেউ কেউ আবার সাবেক এনসিপি নেত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। ১৫ হাজারেরও বেশি মন্তব্য জমা পড়েছে জারার পোস্টটিতে।

শেখ জসিম উদ্দিন চাঁদপুরী নামে একজন লিখেছেন, ‘কতটা ঘৃণিত হলে একটা মানুষের শেষ বিদায়ে পাড়াপ্রতিবেশি কেউ কাছে আসে না। আল্লামা শহীদ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এই জাতির অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসা।’

এইচ এম শাহরিয়ার চৌধুরী নামে এক নেটগেরিকের প্রশংসাসূচক মন্তব্য, ‘ন্যায়ের পক্ষে লেখার মানুষগুলো কেন যেন হারিয়ে গেছে। ধন্যবাদ আপা, ন্যায়ের পক্ষে থাকার জন্য।’

তাপস কুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘ম্যাডাম, এই রকম বাংলাদেশই চেয়েছিলেন। আপনাদের তো সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা! ভালো লাগলো যে আপনি চেষ্টা করছেন!’

তাহমিনা বেগম নামে এক নারী নেটিজেনের মন্তব্য, ‘এমন সুন্দর কথাগুলো সাঈদী সাহেবের সময় কোথায় ছিল?’ এম. ওয়াজির হোসাইন লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের দাফন কিভাবে হয়েছিল, তা কি জানা আছে?’

মো. সেলিম হোসাইন লিখেছেন, ‘সাহসিকতার সাথে সত্য বলার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ তাসনিম জারা,❤️ আশা করি আপনি সবসময় সাহসিকতার সাথে ন্যায়ের পথে কথা বলে যাবেন।’

জারার উদ্দেশে মো. মনির হোসাইন নামে একজনের প্রশ্ন, ‘কবর খুঁড়তে না দেওয়া এটাই কি প্রথম ঘটনা ছিল? দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাথে যে ঘটনাগুলো হয়েছে, সেগুলো সম্বন্ধে আপনি কি অবগত?’

শরীফ মোহাম্মদ আসলাম লিখেছেন, ‘সাঈদী হুজুরকে যখন ঢাকায় জানাজা দিতে দেয়নি, তখন আপনার লেখা স্টাটাসটাও যদি একটু শেয়ার করতেন।’

মো. আলমামুন ইসলাম রাজু নামে এক নেটিজেনের মন্তব্য, ‘ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকে বুঝতে পারতেছি আপনি স্বেচ্ছায় দল থেকে কেন সরে গেছেন।’

পক্ষে-বিপক্ষে এমন দেড় হাজার মন্তব্য জমা পড়েছে তাসনিম জারার পোস্টে। যদিও কারও মন্তব্যেরই কোনো জবাব দেননি এই ভাইরাল চিকিৎসক।

S

পোস্টে যা লিখেছেন তাসনিম জারা

আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।

শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারাদিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। 

তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।’ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব‍্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।

অবশেষে রাত দুইটার দিকে পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।

এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।

আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।’ আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।

মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’- এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন। 

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।

নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। 

ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?

এএইচ