জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
গণহত্যাকারীদের আশ্রয়দাতারা কখনো বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে পালিয়ে গেছে। যারা গণহত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়, তারা বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে না।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা হত্যাকাণ্ডে শহীদ ও আহতদের স্মরণে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর কাঁটাবন মসজিদ কমপ্লেক্সে ইয়াতিমদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়।
এর আগে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মূলত একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। দলটি কখনো প্রকৃত রাজনৈতিক দল ছিল না এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তাদের আদর্শ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনের মতো ক্ষমতা দখল করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে।
আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি নয়, বরং আধিপত্যবাদের পক্ষের শক্তি উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শত জুলুম-নির্যাতনের পরও যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি, তারাই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। দেশের সংকটকালে জনগণকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে রেখে জামায়াতে ইসলামী কখনো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। দলটির কোনো নেতা স্বেচ্ছায় নির্বাসনে লন্ডন বা দিল্লিতে চলে যাননি।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার আগে শেখ মুজিবুর রহমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরই তার প্রকৃত চরিত্র উন্মোচিত হয়। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয় এবং পছন্দের চারটি গণমাধ্যম ছাড়া অন্য সব গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনাও ক্ষমতায় এসে বিরোধী দল ও মত নির্মূলে একের পর এক গণহত্যা চালিয়েছেন এবং মানুষের কণ্ঠরোধ করেছেন। সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি দিল্লিতে পালিয়ে গেছেন।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত-বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগ কখনো ক্ষমতায় আসতে পারত না—এমন আশঙ্কা থেকেই লগি-বৈঠার তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। সেদিন আওয়ামী লীগ আধিপত্যবাদী শক্তির সহযোগিতায় জামায়াত-শিবিরকে নিঃশেষ করতে এই হত্যাকাণ্ড চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে দেশে আবারও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকেই দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছিল। সেদিন থেকেই বাংলাদেশ পথ হারাতে শুরু করে।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। ওই নির্বাচনে ত্রিমুখী সমঝোতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে দেশে আধিপত্যবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। পরে ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচারিক মামলা বাতিল করা হয়। বাদীর সম্মতি ছাড়া হত্যা মামলা বাতিল করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কারও নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, শহীদ পরিবার এবং আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীরা এখনো ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠা হত্যাকাণ্ডের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। যেখান থেকে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড ও গণহত্যার সূচনা, সেখান থেকেই দলটির বিচার শুরু করার আহ্বান জানান তিনি। দ্রুত ২৮ অক্টোবরের দায়ের করা মামলার বিচার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, তা না হলে জাতি বুঝে নেবে, বিএনপি আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচার না করার নিশ্চয়তা দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসেছে।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্ত এবং বাতিল করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির আব্দুস সবুর ফকির বলেন, ২৮ অক্টোবর থেকেই বিএনপি রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙার ইতিহাস সৃষ্টি করে। ওই দিন চারদলীয় জোট সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়ার আগে একটি সমাবেশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে এককভাবে নয়াপল্টনে সমাবেশের আয়োজন করে। বাধ্য হয়ে জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে সমাবেশ আহ্বান করে।
তিনি বলেন, সেদিন বিএনপি রাজনৈতিক ঐক্য না ভাঙলে আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠার তাণ্ডব চালাতে পারত না। ওই ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ভূমিকা আজও প্রশ্নবিদ্ধ। সেদিন আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবের বিরুদ্ধে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল কেন, তা জাতি বুঝতে পেরেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক নুর নবী মানিকের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুফতি মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানী, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ও অফিস সেক্রেটারি কামরুল আহসান হাসান, মহানগরীর সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, শাহবাগ পশ্চিম থানা আমির অ্যাডভোকেট শাহ মাহফুজুল হক চৌধুরী এবং নিউমার্কেট থানা আমির মাওলানা মহিব্বুল হক ফরিদসহ অনেকে।
টিএই/এএইচ