Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

‘সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জ্বালানিখাতে সরকারের ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, গত সাত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। একই সময়ে জ্বালানিখাতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এ কারণে দুই মন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনসিপির সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মানুষ নিজেদের অসহায় বোধ করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি জনগণের সঙ্গে আছে এবং থাকবে। গণবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া জনগণের অধিকার আদায় সম্ভব নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন এবং সংবিধানে কাটাছেঁড়া করছেন। তার অভিযোগ, এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী কায়দায় জনগণের অধিকার স্থায়ীভাবে হরণ করার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্দিন আহমেদের দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জ্বালানিমন্ত্রীর বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানিখাতে সাত মাসেও সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। জ্বালানিমন্ত্রীকে কথা বলতেও দেওয়া হয় না, তিনিও এখন কথা বলেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রীরও পদত্যাগ করা উচিত বলে দাবি করেন এনসিপি আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদের আরও অনেক সদস্যের ব্যর্থতার কথা বলা যায়। তবে আপাতত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে সরিয়ে মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানাচ্ছে এনসিপি। এর আগে তথ্যমন্ত্রীসহ কয়েকজনকে সরিয়ে দেওয়া হলেও কেন তাদের সরানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। যারা দায়িত্ব পালনে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কারওয়ান বাজার থেকে গণসংযোগ কর্মসূচি শুরু করার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি পুরো ঢাকা শহরের কাঁচাবাজার ও সবজির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। সন্ত্রাসী ও দখলদার গোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে।

আগামী ৩০ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ কর্মসূচির কারণ তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, একদিকে মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। সাংবাদিকদের ওপরও হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনায় প্রকাশ্যে গুলি করে এক সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। পরদিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আরেকজনকে গুলি করা হয়। গত ১৯ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। ওই এলাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডায় হামলা এবং বিসিবি চত্বরে সালমান ইত্যাদি স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি।

রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে এনসিপি আহ্বায়ক দাবি করেন, গত নয় মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন। গণপ্রতিনিধিদের মধ্যে ৮৭ জন নিহত হয়েছেন এবং ৬৩৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সমালোচনা বা তথ্য প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করলেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে যে আইন ছিল, সেটি সংশোধনের পরিবর্তে আরও দমনমূলক সাইবার নিরাপত্তা আইন আনার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, কারওয়ান বাজারে সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ থেকে ২১০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং ডিম প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি দেখতে পেয়েছেন। তার অভিযোগ, বাজারে গিয়ে একজন মানুষ প্রয়োজনীয় সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে কিনতে পারছেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও আগের তুলনায় ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কম কিনতে বাধ্য হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন পণ্যের দাম না বাড়ার কথা বললেও বাস্তবে বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের পর এলপিজি গ্যাসের দাম এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন সরকারি হিসাবে তা এক হাজার ৮০০ টাকা এবং বেসরকারিভাবে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

জ্বালানি তেলের দাম প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার তিন দফায় অকটেনের দাম বাড়িয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের কারণে দাম বাড়ছে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে জনগণের সঙ্গে প্রহসন করা হচ্ছে। এই কমিটি ভেঙে দিয়ে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেই পরিষদের মাধ্যমে নতুন সংস্কারকৃত সংবিধান প্রণয়ন এবং জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সাইবার আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী বাদ দিতে হবে এবং কোনোভাবেই সংসদে এ আইন পাস হতে দেওয়া হবে না। গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের মতো কর্তৃত্ববাদী বলে বিবেচিত আইনগুলোও বাতিলের দাবি জানান তিনি।

জুলাই গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ৫ আগস্ট থেকেই তারা বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো সেই বিচার বাস্তবায়িত হতে দেখছেন না। বিভিন্ন এলাকায় জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান এনসিপি আহ্বায়ক।

তিনি জানান, আগামী ৩০ অক্টোবর দুপুর ৩টায় ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। জনগণকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি অধিকার আদায়ের কর্মসূচি। ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে সারাদেশে ধারাবাহিকভাবে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।

এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটি গঠনের কারণ জানতে চাইলে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম বিস্তারের জন্য কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর সংগঠনে অনেক নতুন মানুষ যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে এবং কাউন্সিলের মাধ্যমে পুনর্গঠিত কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপ নেবে।

সরকারপ্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিষয়টি একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। তার অভিযোগ, বিএনপি নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে মামলা-বাণিজ্য ও হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে একধরনের সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার দেশ পরিচালনা করছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সরকার এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানাতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের প্রতি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান এনসিপি আহ্বায়ক।

তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি। সরকার বা ব্যক্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

টিএই/এসআই