নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দিনরাত এক করে কাজ করার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে ভবিষ্যতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না বলে তিনি আশা করেন।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা থামব না, আমাদের থামার সুযোগ নেই। সামনে সিটি নির্বাচনে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ও দিনরাত এক করে কাজ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এবার এগুলোর আলোকে কাজ করলে আশা করি, আর ভুল হবে না।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর জান্নাতে যাওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, যাঁরা দিন এনে দিন খান, আল্লাহর পথে তাঁদের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৭০ ভাগ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন, যাঁরা দিন এনে দিন খান।
রুকনদের উদ্দেশে তিনি অতীত সময়ে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সংগঠন পরিচালনায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নসিহতমূলক বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ যাঁদের সম্পদ দিয়েছেন, তাঁরা যেন তাঁর নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। জান্নাতের জন্য নিজেদের ঠিকানা তৈরি করতে হবে।
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে রুকনদের উদ্দেশে আলোচনা করেন তিনি। এ সময় মৃত্যু ও পরকালীন জীবন নিয়েও কথা বলেন।
তিনি বলেন, নিজের চেয়ে জ্ঞান ও সম্পদের দিক থেকে দুর্বল মানুষের কথা বিবেচনা করতে হবে। মহান আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য চোখের পানি ফেলে তাঁর শুকরিয়া আদায় করতে হবে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
নবী ইবরাহিম (আ.) ও নবী ইসমাইল (আ.)-এর ওপর আল্লাহর পরীক্ষা এবং তাঁদের ত্যাগের বিষয়েও আলোচনা করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারব না। তাই প্রতি মুহূর্তে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।
একটি সার্থক জীবন গড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তাওফিক কামনা করে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ যেন আমাদের সেই তাওফিক দান করেন।

ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের অতীত সাংগঠনিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দুই মহানগরীর অবস্থাই অনেক দুর্বল ছিল। নেতা-কর্মীদের ত্যাগ, কোরবানি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ তাঁদের ভোট দিয়েছেন, কিন্তু তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। জনগণ তাঁদের বলেন, ভোট আপনাদের দিয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা তা রক্ষা করতে পারলেন না। তখন তাঁদের বলতে হয়, তাঁদের দুর্বলতা ছিল।
তিনি বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া যে মানুষ তাঁদের এত ভালোবাসা দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা গেছে। ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানের বড় নিয়ামত রয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, এই দেশের জনগণই ঠিক করবেন, দেশ কারা পরিচালনা করবেন।
সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁরা বসে বসে আর তামাশা দেখবেন না। সংগতভাবেই প্রতিবাদ করবেন এবং যেখানে সামর্থ্য হবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।
তিনি আরও বলেন, এই দেশ কোরআনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ যেন তাঁর রহমতের চাদরে তাঁদের আবৃত রাখেন এবং সহযোগিতা করেন।
আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য রুকনদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে তৈরি ‘নাগরিক সেবা’ নামের একটি অ্যাপ উদ্বোধন করেন তিনি। কর্তৃপক্ষ জানায়, অ্যাপটিতে নাগরিকদের জন্য ৫০টিরও বেশি সেবামূলক সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকনিয়াত কোনো পদ-পদবি নয়, এটি একটি মান। তাই এটিকে ক্ষমতা মনে করলে ভুল হবে।
তিনি আরও বলেন, রুকনিয়াত হলো জীবনে নীতি-নৈতিকতার মান বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রুকন হিসেবে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। রুকনদের মান ও রুহানিয়াত যত শক্তিশালী হবে, সংগঠনও তত শক্তিশালী হবে। আগামী মেয়র নির্বাচনে শক্তিশালী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। তাহলে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে যথাযথ সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, রুকন সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি মানের দিক থেকেও ভালো, উন্নত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। আস্থাভাজন নেতৃত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি মজবুত সংগঠন গড়ে তোলা হবে, ইনশা আল্লাহ।
সম্মেলনটি দুটি পর্বে বিভক্ত ছিল। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট থেকে ১১টা পর্যন্ত নির্বাচনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির নির্বাচনে রুকনরা ভোট দেন। এতে ১৩ হাজারের বেশি সদস্য (রুকন) ভোট দেন।
নির্বাচন পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন। তাঁকে সহায়তা করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য আ. সবুর ফকির।
সকাল ১১টা থেকে সাংগঠনিক অধিবেশন শুরু হয়। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি। বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন ও নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি।
এআর