Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

দূরত্ব বাড়ছে সরকার-বিরোধীদের, উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতি

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন

২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

  • গণভোট নিয়ে সরকার-জামায়াত বিরোধ
  • প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে নতুন বিতর্ক
  • রাজপথে ১১-দলীয় জোটের কর্মসূচি
  • ৮ মাসে ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ১ এমপির পদত্যাগ
  • দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধ
  • ২২ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ২১৩
  • সমঝোতার বদলে বাড়ছে দূরত্ব

সংসদের বিতর্ক ছাপিয়ে সরকার ও প্রধান বিরোধী জোটের বিরোধ এখন রাজপথেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্যের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দখল-চাঁদাবাজি এবং মাঠপর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনায় রাজনীতির মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের যোগসাজশের অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে সরকারের আট মাসের মাথায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সম্পর্কের টানাপড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সরকার ও বিরোধী জোটের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের ফল এবং সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি। সংসদে এ নিয়ে মতপার্থক্যের পাশাপাশি রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করছে বিরোধী জোট। অন্যদিকে বিএনপির নেতারাও বিভিন্ন বক্তব্যে বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন। কখনো কখনো এসব বক্তব্যে কটাক্ষও থাকছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ফেনীর ফুলগাজীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে দুই পক্ষের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিরোধ বাড়াচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য

গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর মাদরাসা মাঠে এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। অর্থ সরবরাহ করে কাদের সাহায্য করছে? এই যে কিছু লোক আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশে, যারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে মিথ্যা কথা বলে। এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে। আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। এদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

18

গত ১ আগস্ট ফেনীর ফুলগাজিতে এক সমাবেশে জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে সরকার প্রধান বলেন, আমরা ‘স্বৈরাচার’ পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পরে কী দেখলাম? এই ‘গুপ্তবাহিনীর’ লোকজন বলল যে, তারা (পতিত স্বৈরাচার) যদি আসে, থাকে, কাজ করে, রাজনীতি করে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি থাকবে কেমন করে? বরাবরই তো এরা একসঙ্গে ছিল। ১৯৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিল, ১৯৮৬ সালেও একসঙ্গে ছিল। গত নির্বাচনের সময়ও তারা একসঙ্গেই ছিল; তলে তলে কাজ করেছিল। এজন্য তাদেরকে গুপ্ত বলা হয়। আজ আবার তারা এবং ওরা, যারা পালিয়ে গেছে, এই স্বৈরাচার এবং গুপ্ত, আবার একসঙ্গে হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, যারা গুপ্ত রাজনীতি করে, যারা স্বৈরাচারী রাজনীতি করে, যাদের কাছে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করার কোনো কর্মসূচি নেই, শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যারা রাজনীতি করে, তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। তাদের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ এরা যদি দেশের দায়িত্ব পায়, তাহলে তারা আর যাই করুক, জনগণের জন্য কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করবে না। যদি জনগণের জন্য তাদের কোনো কর্মসূচি থাকত, তাহলে তারা বলতে পারত যে, কী কর্মসূচি তারা গ্রহণ করতে পারে? আজ পর্যন্ত জনগণের উপকার হয়— এমন কোনো কর্মসূচির কথা তারা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।

19

অন্যদিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সরকার বিরোধীদলের সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য নয়। আজ থেকে সরকারকে নয়, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধীদল।

জামায়াত আমির বলেন, বিএনপি ৫ আগস্ট পর্যন্ত মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। বিএনপি বদলে গেলেও আমরা বদলাবো না। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন করেই ছাড়বো।  সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অপরাধ। তার মতে, এই আন্দোলন শুধু ১১ দলের নয়, বরং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন।

গণভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ

গণভোটের রায় নিয়ে বিরোধ

সরকার ও বিরোধী জোটের বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করাই ছিল এই পরিষদের মূল কাজ।

জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি জোট ওই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের অবস্থান, সংবিধানে এমন পরিষদের অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির বক্তব্য, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় এবং জুলাই জাতীয় সনদে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাবকে ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণভোট আয়োজনের জন্য যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস না হওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। বিএনপি সরকার জুলাই জাতীয় সনদ ও তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে বিশেষ কমিটি। তবে ওই কমিটিতে যোগ দেয়নি জামায়াত-এনসিপি জোট।

এখানেই বিরোধটি শুধু সংস্কারের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। জামায়াত ও এনসিপি গণভোটের রায়কে সংস্কার কার্যক্রমের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে সরকার সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কারবিষয়ক বিশেষ কমিটির ইতোমধ্যে চারটি সভা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ না থাকায় রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ বিকেলে

রাজপথে চাপ বাড়াচ্ছে ১১-দলীয় জোট

সংসদে মতপার্থক্যের পাশাপাশি রাজপথেও নিজেদের অবস্থান জোরালো করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তারা ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। পরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলোর উদ্দেশে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করে জোটটি। ওই কর্মসূচিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। জোটের নেতারা কর্মসূচিকে সরকার পতনের আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করতে চাননি। জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের তখন বলেছিলেন, এটি সরকার পতনের আন্দোলন নয়, বরং সরকারের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল’।

তবে ধারাবাহিক কর্মসূচির বিস্তৃতি সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে জামায়াত ও এনসিপি পৃথক কর্মসূচিও পালন করেছে। ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হলে তাদের আন্দোলন যেকোনো সময় এক দফায় রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান দাবিদাওয়ার আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না জোটটি।

বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের সংঘাত

জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পর্যায়েও। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মিছিল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনা ঘটছে। এতে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বিরোধ তৃণমূলেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত আগস্টে রাজধানীর পল্লবীতে বিহারি ক্যাম্পে মৃতদেহের গোসলঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতপন্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পাশাপাশি ফাঁকা গুলি ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। একই মাসে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে বিএনপির স্থানীয় কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাও যুক্ত হচ্ছে। শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে কঠোরতা বাড়লে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় কোনো বিরোধও এ পরিস্থিতিতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগে আসকের নিন্দা

রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যান

দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২২ মাসে দেশে ৯৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৯৫ জন।

আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৬৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫২৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন ১৯৭ জন।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মনিটরিং প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জুনে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ব্যাপক গ্রেফতার, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার এবং সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সূচকে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের তুলনায় জুনে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত ছিল। নিহতের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও আহতের সংখ্যা বেড়েছিল ৭৭ শতাংশ। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে, আহতের সংখ্যা বৃদ্ধির এই চিত্র আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-লুটপাটে গ্রেফতার ৯, মালামাল উদ্ধার

রাতের আঁধারে হাসপাতাল গুঁড়িয়ে বিতর্ক তুঙ্গে

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম সামনে আসে। এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে। যার প্রেক্ষিতে এই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন সরকারপ্রধান। পদ খোয়ান এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। এছাড়াও ঢাকা মহনগর বিএনপির উত্তরের কমিটি ও অঙ্গ-সংগঠনের একাধিক ইউনিটের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানে ভাঙচুর-আগুন, ৪ মামলায় আসামি দুই হাজার

ঢাকা-১৭ আসন ঘিরেও টানাপড়েন

সরকার ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্বের সাম্প্রতিক দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে রাজধানীর ঢাকা-১৭ আসনে। এই আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। কয়েক দিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে না জানিয়েই মিরপুর এলাকায় হকার উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। এ সময় পুলিশ ও হকারদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, যা একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।

ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন জামায়াত আমির। সেখানে তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে অভিযান পরিচালনা করা হলে বিষয়টি আরও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঘটনাটি সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক অভিযান হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াত আমিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সমন্বয় না থাকার বিষয়টি দুই পক্ষের সম্পর্কের টানাপড়েনের আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর

বিমানবন্দরে গ্রেফতার জামায়াত নেতা

রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সম্প্রতি বিমানবন্দরে এক অপ্রীতিকর ঘটনার পর জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনাও বিরোধী দলের চলমান আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে।

তার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগদান করার ক্ষোভে সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করেছে। একজন সিনিয়র সিটিজেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অদক্ষতা নিয়ে কথা বলতে পারেন। প্রয়োজনে অপদার্থ, ব্যর্থ, অদক্ষ কর্মকর্তাদের শাসাতেও পারেন। কিন্তু সরকার বিমানবন্দরের ওই ঘটনাকে ইস্যু করে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ
ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ

আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা জামায়াতের

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, তাদের চলমান আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং দেশ ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। জনগণের মৌলিক অধিকার, জানমালের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকার এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই সনদ, আদেশ ও গণভোটের ফল সরকার উপেক্ষা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষায়, এর মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট ও আকাঙ্ক্ষাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

৮ মাসে বিএনপির ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ১ এমপির পদত্যাগ

৮ মাসে ৩ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ১ এমপির পদত্যাগ

এদিকে সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যে বিএনপির তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।

এর আগে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ ছাড়েন জহির উদ্দিন স্বপন; একই দিন তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়।

আর মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি ১ অক্টোবর পদত্যাগপত্র জমা দেন।

রাজনৈতিক সমঝোতার পথ কতটা খোলা

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে বিরোধের কয়েকটি ধারা একই সঙ্গে সক্রিয়। সংসদে গণভোটের রায় ও সাংবিধানিক সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। সংসদের বাইরে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখছে বিরোধী জোট। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই পক্ষের শীর্ষ নেতাদের কঠোর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

বিরোধের একটি অংশ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও অন্য অংশে রয়েছে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার নিয়ে অসন্তোষ। ফলে একক কোনো ইস্যুতে সমঝোতা হলেও সামগ্রিক রাজনৈতিক দূরত্ব কমবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং জামায়াতের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সরকার বিরোধী জোটের কর্মসূচিকে কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং বিরোধী জোট সংসদীয় আলোচনায় ফিরবে কি না, তার ওপর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে।

সংসদীয় বিতর্কের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি ও স্থানীয় সংঘাত অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিপরীতে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং অন্যান্য বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি হলে উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের অবস্থানে বড় ধরনের সমন্বয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। ফলে সরকারের আট মাসের মাথায় রাজনৈতিক অঙ্গনে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কমার বদলে আরও বাড়ছে বলেই পরিস্থিতির সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, রাজনীতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং চব্বিশের আগের রাজনীতিই ফিরে এসেছে। সবাই মিলে দেশ পরিচালনার পরিবর্তে প্রতিদিনই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে। বিরোধ পাল্টা বিরোধ—এসব নিয়েই ব্যস্ত সবাই। অথচ তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও গণঅভ্যুত্থানের মূল দাবিগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এত মানুষের প্রাণহানি ও রক্তের বিনিময়েও রাজনীতিতে হতাশা কাটেনি।

দেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ আগের পথেই চলবে। দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতি বাড়বে, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থা দুর্বল হবে। একপর্যায়ে আবারও গুমের মতো ঘটনা শুরু হতে পারে, তাই সময় থাকতে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।’

টিএই/এএস